পৃষ্ঠাসমূহ

শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

সাগরকন্যা মাইজদী...



                                            একাত্তরের পুর্বের মাইজদী,

ছোট বেলায় আমার একটা অসুখ ছিল।অসুখ ছিল মাথা গুরানির অসুখ।এই চার ছয় মাস ভাল আছি।ঋষ্টপিষ্ট সুন্দর চপল প্রকৃতির খোকা ছিলম আমি।হঠাৎ করে মাথা গুরানি উঠলে বমির পর বমি আসতো।কিছুই খেতে পারতামনা।একনাগাড়ে চার পাঁচদিন ঠান্ডা বিছানায় কাঠ হয়ে পড়ে থাকতাম। মা বারবার কলার বরগ মাথার তলে দিয়ে পানি ঢালতেন, অন্য কোন কাজের বেডিকে দিয়েও ঢালাতেন। আবার আমার সেজবোন নুর নাহারও অনবরত পানি ঢালতেন।কোন ঔষুধপত্ত লাগতো না, এমনিতেই ভালো হয়ে যেতাম।এরকম অসুখবিসুক থাকলেও আমার শ্মরন শক্তি ছিল অত্যান্ত প্রখর।এখনও এই মধ্য বয়সেও সেই রকমই আছে।আর তাই শৈশবের সৃতিগুলি আজ কায়মনে অনর্গল আওড়ানোর চেষ্টা করছি।
আমরা ভাই বেরাদর কেহই আমার দাদাকে দেখিনি।আমার দাদা এমরাত আলি নাকি অল্প বয়সেই আট সন্তান রেখে মারা গিয়েছেন।সাত ছেলে এক মেয়ে।বাবার  এবং দাদির মুখে শুনেছি তাঁর নাকি পেটের ব্যদনার অসুখ ছিল।দাদাকে না দেখলে কি হবে আমরা চাচাতো ভাই জেটাতো ভাই প্রায় সবাই দাদিকে দেখেছি।এই তো সেদিন উন্নিশ ছিয়াশি সালের মাঝামাঝি সময়ে শতাধিক বছর বয়সে আমার দাদি ইন্তেকাল করেছিলন। আমার শ্পষ্ট খেয়াল আছে সেদিন সন্ধায় আমিই দাদির সাথে শেষ কথা বলেছিলাম।দাদির ঘর আমাদের ঘরের সামনে ছিল।সন্ধ্যেবেলায় মা আমাকে কিছু পান সুপারি দিয়ে বললো তোর দাদিকে দিয়ে আয়।আমি দিতে গেলে দাদি বললো কিচু সেঁছে দে।দাদির মুখে একটি দাঁতও ছিল না।তাই বড় লৌহার একটা সেঁছনি একটা মাটির কলস আর দুতিনটা মাটির ভাসন আর নারিকেলের মালার কয়টা  টকবা ছিল দাদির সম্পদ।  দাদি থাকতেন একটি ছোট ছনের ঘরে, পরে অবশ্য একোয়ারের পর সবাই মিলে উনাকে বড় করে টিনের একটা ঘর করে দিয়েছিলেনে। উনি সে ঘরে একেলা থাকতেন।বেশ বড় একটি চৌকিতে গুমাতেন। মাঝেমধ্যে আমার কাজিন ব্রাদার মাহার সেলিম ভাই এসে দাদির সাথে গুমাতেন।দাদির সেই ঘরে তার সাত সন্তান সবাই বুড়ো বুড়ো নাতি নাতকুর সবাই এসে বসতেনেআসে পাসের পড়সিরাও এসে বসতেন। দাদির সাথে কথা বলতেন আড্ডা দিতেন দাদিকে পান সেঁছে দিতেন।নিজেরাও খেতেন,পাতিল ভরে কেউ হয়তো লাল চা বানিয়ে দিয়ে যেতেন।ভাসন ভরে মিটা ছাড়া লবন চা টগবা ভরে খেতেন। দাদির জন্য খাবারও আসতো সবার ঘর থেকে।কোন বাঁধাধরা নিয়ম ছিলনা।বেশির বাগই যেত আমাদের ঘর থেকে।দাদি আমার মায়ের হাতের খাবারই বেশি পছন্দ করতেন।আমার মাকে এবং আমার মাকেও বেশি ভালোবাসতেন।আমার মা-ই ছিল বাড়ির সবছেয়ে বড়বধু। যদিও আমার বাবা ছিলেন সবার মধ্যে সেজ।
সেই এক রুপ কথার গল্পের মত। অনেক কথা অনেক গল্প কোনটা থুয়ে কোনটা বলবো।একজন হিন্দু কবিরাজ দাদির ঘরে এসে বসতেন,দাদিকে ঔষুধ দাওয়াই দিতেন।একআনা দুআনা পয়সা দাদি তার হাতে দিতেন। সেই কবিরাজের নাম ছিল হরকুমার।তার মুখেও একটি দাঁতও ছিলনা।দাদির মত সেঁছা পান খেতেন।মুখদিয়ে লাল লাল পানের রস গড়িয়ে পড়তো।হরকুমারের ছিল এক পুত্র, সেও আবার কবিরাজ।তার নাম ছিল নরকুমার। তার মুখে ছিল মাত্র একটা দাঁত। সেও সেঁছা পান চিবাতো।আমার শ্পষ্ট খেয়াল আছে অনেক সময় এই কবিরাজদের নিয়ে হাসির তুফান উঠতো দাদির ঘরে।
দাদি আমাকে ভাই ডাকতো।সেই নেংটা বয়স থেকে দাদি আমাকে সাথে নিয়ে পুকুরে গড়ে মাছ ধরতে যেতেন।সেসময় মছে ভরা ছিল পুকুর ডোবা কুয়া গড়ে।অনেক গুলি বড়শি পেলে রাখতেন।পেতেনও একটু পরপর উঠাতেন।মাছ ধরে থাকতো। পরে মাছ নিয়ে মায়ের কাছে দিতেন মা পাকায়ে দিতেন।দাদি অনেক সময় আমাকে খেপাতো এই বলে যে অমুকের গরু তোগো ধান খাই পালাইতেছে।আমি তখন গালাগালি করতে করতে বাড়ির সামনের দিকে ছুট দিতাম।আর মা আমাকে কোলে করে তুলে আনতেন।
ছোট বেলায় মা আমাকে একটা লুঙ্গি কিনে দিয়েছিল।আমি লুঙ্গিটা মোটেই পিন্দতামনা। সমবয়সি সবাই থাকতো বেশির ভাগই নেংটা।আমি কেন লুঙ্গি পিন্দবো? আমি লুঙ্গিটা সবসময় কাঁদে ঝুলিয়ে রাখতাম।একবার আমরা সমবয়সি কয়টা ছেলে পুকুর পাড়ে পাঠ কাটি জ্বেলে বিঁড়ির মত খাচ্ছিলাম।সবাই নেংটা বাদাম।হঠাৎ করে আমার চাচাতো ভাই রহিম জলিলের মাথায় জোরে দুষ্টমি করে একটি পাদ দিল।জলিল মাথা নোয়ায়ে হরমুল ধিরাচ্ছিল। অমনি রহিমের পাদের সাথে সাথে বাহির হলো পাতলা পায়খানা।আর সবগুলি জলিলের মুখে মাথায়।সাথে সাথে সবাই হাসতে হাসতে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
 
তখনও আমাদের দেশটা ছিল অখন্ড পাকিস্তানের পাঁচটা প্রদেশের মধ্যে একটা মাত্র প্রদেশ বা খন্ড।যা পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিগনিত হত।চীপ মার্শল লৌহ মানব হিসেবে খ্যাত আইয়ূব খান তখন অখন্ড পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্টিত।বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের দাবিতে পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যযজ্ঞের পর পুঁষে উঠা বাঙ্গালী যুক্তফ্রন্ট ঘটন করে সরকার ঘটন করে।যুক্তফ্রন্টের সংসদে একটি মারামারিও হট্রগোলকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলার অযুহাত তুলে জেনারেল আইয়ূব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তিনি সর্বেসর্বা হয়ে বসলেন।তিনি অসুন্তষ্ট বাঙ্গালীকে সন্তুষ্ট করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করলেন।প্রথমে তিনি একটি বই লিখলেন, প্রভূ নয় বন্ধু।তারপর তিনি বেসিক ডেমক্রেসি বা মৌলিক গনতন্ত্র  নামে এক অদ্ভূত গনতন্ত্রের নাম ঘোষনা করলেন।তাছাড়া তিনি অবহেলিত অনুন্নত পুর্ব পাকিস্তানে উন্নতির জন্য বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহন করেন। এমনকি এই স্বৈরচার বাংলা ভাষাকেও বদল বাংলা উর্দু মিলায়ে এক অদ্ভূত ভাষা সৃষ্টি করারও পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।যা ডান বাম দিক থেকে নয় চায়না ভাষার মত উপরের দিক থেকে লিখা হবে।ইতিহাস বলে অখন্ড পাকিস্তানে একমাত্র আইয়ূবের শাসনামলেই বেশি উন্নতি হয়েছিল।সে যাই হউক আইয়ূবের সেই উন্নিতির বলি হয়েছি আমরা পশ্চিম মাইজদীর শতাধিক পরিবার।
 
একোয়ারে আমাদের বিশাল বাড়িটার প্রায় কম অর্ধেক পড়ে গেল।আমাদের দুটা বড় পুকুরের অর্ধ্যেক ভরাট করে,বাগানের গাছগাছরা কেটে টোটালি উদাম নেংটা বাড়িতে পরিণত করলো।দক্ষিন দিকে ছাড়া বাড়িতে পর্যাপ্ত জায়গা থাকাতে জঙ্গল কেটে কয়েকটি পরিবার সেখানে ঘর সরিয়ে নিল। আবার দুতিনটি পরিবার দুরে অন্যত্র গিয়ে ঘর বাঁধল।











   

শুক্রবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

সাগরকন্যা মাইজদী...বৃহত্তম

                                বৃহত্তম নোয়াখালী জেলার প্রাণকেন্দ্র ছিল এই মাইজদী শহর,


 বৃহত্তম নোয়াখালী বাসীর অনেকেই হয়তো আদো জানেনা প্রাচীন নোয়াখালীর ইতিহাস। একসময় প্রাচীন সভ্যতার এক সুবিশাল সুতিকাগার ছিল আমাদের এই প্রাণের প্রিয় নোয়াখালী।সেই ছিল এক বিশ্ময়।গঙ্গা যমুনা পদ্মা মেঘনা ব্রম্মাপুত্র আর তিব্বত হিমালয় কৈলাশের প্রবিত্র ধুলোবালি এসে উর্বর পলিমাটির সোনার আকরে পরিণত করেছিল আমাদের এই নোয়াখালীর মাটিকে।নোয়াখালীর মাটির মত এত উৎকৃষ্ট উর্বর মাটি আমি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি।এতই উর্বর যে শুধু এক মুঠো শুকনো বীজ বপে দিলেই এখানে ফলতো সোনালি ফসল,আর গজিয়ে উঠতো ফুল-ফলাদি বৃক্ষ।ভরে যেত কিষানের গোলা,খই এর মত হাসি ফুটতো তরুন তরুনীর মুখে।এক দুই নয় বছরে তিন চার খোন্দ ফসল ফলতো নোয়াখালীর উর্বর মাটিতে।এমন উর্বর মাটির সন্ধান আমি পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাইনি।গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ আর বাগান ভরা ছিল নানা জাতের ফলফলাদি।গুবাক নাড়িকেল খেজুর আর তাল তমালের বৃক্ষ ছিল সারি সারি।খেতে খেতে ফলতো নানা জাতের সুগন্ধি ধান,সাক্কর খোরা, কালিজিরা, কনকচুড়া আর বিন্নি ধানের সুগন্ধে মৌ মৌ করতো পানোরমা।ধান কাটার মৌশমে উপছে পড়তো কৃষানের মুখে হাসি।ধান কাটার ধান লাগানোর সময় কৃষানের জারিসারি গানের সুরে মুখরিত হতো দিগন্তবদি।আহা! সে কি আনন্দের দিন গুলি।সবদিক দিয়ে স্বাভলম্বি ও সম্বৃদ্ধশালি মানুষ ছিল এই নোয়াখালী বাসী।আর সেই কারণেই বলা যায় নোয়াখালী শুধু বাংলাদেশের নয় সমগ্র বিশ্বের মাঝে একটি শ্রেষ্ট জেলা,আর আমরা নোয়াখাইল্যারা হলাম শ্রেষ্ট জাতি।

এই উর্বর শ্যামল মাটিই সূখি ও সম্বৃদ্ধ করে তুলেছিল নোয়াখালী বাসীকে।আর সেই কারণেই ক্ষিরোদ সাগরের উপকুলে সুবর্ন সমতটে প্রাচীন সভ্যতার এক বিশাল অটবী গজিয়ে উঠেছিল নোয়াখালীর মাটিতে।নোয়াখালী বাসীর ছিল প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি।ছিল অসাধরণ আন্তরিকতা উদারতা এবং মহানুভবতা।সেই কারণেই প্রাচীন ভূলুয়া বন্দর পরবর্তিতে সন্দিপ বন্দর জগত জুড়ে খ্যাতি লাভ করেছিল।এই সন্দিপ বন্দরেই এসে নোঙর ফেলতো ভীন দেশি হরেক রকমের জাহাজ। আগমন ঘেটেছিল বেনিয়া ওলন্দাজ হার্মাদ, গ্রীস মগ পার্সিয়য়ান ফরাসি আর ওরিয়েন্টাল আরবি বেদুঈন সওদাগরদের।প্রাচ্য প্রাশ্চাত্বের বনিক বেনিয়া মুনিঋষি জ্ঞানি গুনি কবি সাহিত্যিক দার্শণিকরা ভিড় জমিয়েছিল এখানে।তারা এসে এখানেই খুঁজে পেয়েছিল  দুদন্ড শান্তির ঠিকানা।তারা গড়ে তুলেছিল নানা কারুকার্য খচিত  বাড়িঘর দোকান পাট অফিস আদালত মক্তব মাদরাসা মসজিদ মন্দির পাঠাগার।তাদের পদভারে একদিন মুখরিত হয়ে উঠতো এই ঐতিহাসিক নগরি।আজকের দিনের সিটি করপোরেশন বা কসমপলিট সোস্যাইটির চেয়ে কোন অংশে কম ছিলনা সেই নগরটা। সে সভ্যতার কথা আজ  আমাদের অনেকেরই অজানা।

রাক্ষুসী সমুদ্রের অতল গহব্বরে তলিয়ে যাওয়া আমাদের হাজার হাজার বছরের হারানো ঐতিহ্য প্রাচুর্য ও সভ্যতার সেই এক করুন অধ্যায়। অরচিত অরক্ষিত ইতিহাসের নির্মমতায় আর প্রাকৃতির ভয়াভহতায় বার বার আসমানকেও বিধির্ন করেছে নোয়াখালী বাসির করুন কান্নার ট্রেজিডি।নোয়াখালী বাসীর প্রাণের আকুতি আর কান্নার তুফান আকাশে বাতাসে আর সাগরের নোনা জলের সাথে আজো মিশে আছে।এই তো সেদিনের কথা সত্তরের বারই নভেম্বরে একরাতেই দশ লক্ষাধিক মানুষের তাজা প্রাণ কেড়ে নিল ভয়ানক জলউচ্ছাস গোর্কি।

 নোয়া খাল থেকে নোয়াখালী জেলার উৎপত্তি বা নাম করণ করা হয়েছে।ইতিহাসবেত্তাদের মনগড়া এই নীতি কথা আমার বিশ্বাস করতে খুবি কষ্ট হয়, দুঃখও হয়। সবাই শুধু নোয়াখালী নোয়াখালী নোয়াখালীর হতিহাসের কথা বলছে। আরে ভাই তাহলে আমাদের পুরান খালীর ইতিহাস গেল কই।সে যে ছিল এক অমর রুপ কথার ইতিহাস।হারিয়ে যাওয়া পম্পে নগরির করুন ইতিহাস!

আমরা সকলেই জানি উত্তর নোয়াখালিতে পানি নিঃষ্কাশনের জন্য চৌমুহানীর পাশ দিয়ে একটা নোয়া খাল খনন করে উত্তরে ডাকাতিয়া নদী ও পুর্বে ফেনি নদীর সাথে সংযোগ স্হাপন করা হয়েছিল।বলা বাহুল্য সে খালের আজ কোন অস্তিত্বই খুজে পাওয়া মুশকিল।তবু ওরা বলে বেড়ায় নোয়া খাল থেকে নোয়াখালী নাম করন হয়েছে। তা হলে আমার জিজ্ঞাসা পুরানখালীতে কি কোন পুরান খাল ছিল?নোয়াখাইল্যা দ্বীন মোহাম্মদ শেম্পু আবিষ্কার করে বিশ্ব বিজয় করার ইতিহাস তো আজো সবার অজানা। 
কেহই সঠিকভাবে বলতে পারেনা পুরানখালীর ইতিহাস। কিন্তু রুদ্র ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজো মাইজদী বড় জামে মসজিদে দুচারটি ঝাড়বাতি ঝুলছে।মানব সভ্যতার আরেক শহর আলেক জান্দ্রীয়ার মত আমাদের পুরানখালী শহরটাও সাগর গর্ভে বিলীন হবার পূর্বে তড়িগড়ি করে এই ঝাড়বাত্তি গুলি নিয়ে এসে এই জামে মসজিদে সংরক্ষন করে রাখা হয়েছে।এই জাড়বাত্তি গুলি দেখলেই অনুমান করা যায় কতই না অনিন্দ সুন্দর ও উন্নত মানের ছিল আমাদের পুরান খালি শহরটা।মহাকালের সাক্ষী হয়ে আছে সোনুপুরে অবস্হিত রাণীর গীর্জা এবং দক্ষীন দিকে হেলান দিয়ে পড়া কয়েকটি নাড়িকেল গাছ।কালের আরো সাক্ষী হয়ে আছে, নোয়াখালীতে আজো বসবাস করিতেছে ভীন দেশি গোরা বর্ণের কিছু মানুষ।তারা সতাব্দীর পর সতাব্দী মাইজদীতে বসবাস করলেও নোয়াখালীর ভাষায় কথা বললেও সুশ্পষ্ট অনুধাবন করা যায় যে এরা সবাই আজনবী বা পরদেশি।অনেকে আবার গর্ব করে বলে থাকে আমাদের পূর্ব পুরুষরা ধর্ম প্রচার করতে এদেশে এসেছিল,আর ফিরে যাওয়া হয়নি।টোটালি মিথ্যে কথা ভাগ্যের অণ্বেষনে যে এসেছিল সে কথা কৌশলে এড়িয়ে যায় সবাই। তাদের হাবভাব দেখেই বুঝা যায় নোয়াখালী যে কত সম্বৃদ্ধ ছিল।
এই ভয়াল ভয়ানক থাবা থেকে বাঁচতে সরল সিদা নোয়াখালি বাসি সিত্তিসান হয়ে দেশ দেশান্তরে পাড়ি জমিয়েছে। অনেক তামাসা করে বলে নোয়াখাইল্যাকে মাটির নীচেও পাওয়া যায় আবার চাঁদে গেলেও পাওয়া যায়।এমনো তো হতে পারে চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন প্রথম নোয়াখাইল্যারাই দেখেছিল।এমনও তো হতে পারে আমেরিগো ভেচপুচি বা কলম্বাস নয় আহাম্মেদ নামে কোন বাঙ্গালীই প্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করেছে।
আজ সময় হয়েছে প্রচুর গভেষনা করে আমাদের হারিয়ে যাওয়া কৃষ্টি কার্লচার পুনুরুদ্ধার করে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার।যাতে করে ওরা বুঝতে পারে আমরা বানের পানিতে ভেস আসা কোন জাতি গোষ্টি নয়।আমাদেরও সুনির্দিষ্ট একটা জাতিসত্বা আছে।পৃথিবীর যে কোন উন্নত জাতির সাথে আমাদের তুলনা করা চলে।ধন্য নোয়াখালীর মাটি,ধন্য নোয়াখালী বাসী, ধন্য মাইজদী, আই লাভ ইউ।

মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

সাগরকন্যা মাইজদী..





                                   একাত্তরের পূর্বের মাইজদী

একাত্তরের পূর্বে আমাদের প্রিয় মাইজদী গাঁ-টা ছিল ছায়ায় মায়ায় ঘেরা শান্তশিষ্ট শোনসান সুনিবিড় একটি অনিন্দ সুন্দর গ্রাম।দিগন্তবদি ছিল হরিৎ রঙের মেলা,চতুর্দিকে সুন্দরের চড়াচড়ি।দুর দুরান্তের পথিক পর্যটক মানুষ এটাকে মাইজদী শহর বা মাইজদী কোর্ট বলে সন্বোধন করলেও আমাদের কাছে এটা ছিল শুধুই মাইজদী গাঁ বা মাইজদী গেরাম।আমরা চিটিপত্রেও  ভিলেজ মাইজদী গ্রামই লিখতাম।অনেকে আবার মাইজদীকে এক গল্লির শহরও বলতো।

উন্নিশ আটশট্টি সালের দিকে আমি তখনও কোলের শিশুই প্রায়।তখন আমার বয়স ছিল সাড়ে তিন কি চার বছর।আমার চাচাতো বোন রাজিয়ার বিয়ে হতে যাচ্ছিল। রাজিয়া ছিল এতিম মা-হারা মেয়ে।রাজিয়ারা ভাইবোন দুজনকে রেখে রাজিয়া ভিজার মা অল্প বয়সেই মারা গেছেন।কথিত আছে বড় টাকার বান্ডিল দেখেই নাকি হার্টফেল করে মারা গিয়েছিলেন তিনি।সত্যমিথ্যা কিছুই জানিনা। মুলত শুনা কথা। রাজিয়া ভিজার মা আমার আপন চাচি হলেও রিস্তায় তিনি আমার মায়ের  মামাতো বোন ছিলেন। মা-ই নাকি ওকালতি করে  তাকে আমার হাবিব উল্লা চাচার সাথে বিয়ে দিয়েছেন।সেই যাই হউক আমরা আমাদের সেই চাচিকে কখনও দেখিনি।দেখেছি রাজিয়া ভিজাকে।নিশ্চয় রাজিয়া ভিজার মতই তার মাও ছিলেন।রাজিয়া ভিজা শান্ত শিষ্ট গুরু গম্ভির এবং বুদ্ধিমতি ছিলেন।তিনি বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসলে আমাদের ঘরে আসতেন। আমার মা এর সাথে বসে বসে কথা বলতেন।তারা ঢাকাতে থাকতেন, আমি একদুবার উনার বাসায় গিয়েছিলাম। আপন ভাইয়ের মতই তিনি আমাকে আদর সমাদর করেছেন।আমার সেই চাচাতো বোন রাজিয়া ভিজা কিছুদিন আগে ইন্তেকাল হয়েছেন।তাকে মাটি দেওয়া হয়েছে আমাদের বাড়ির সামনে মসজিদের পাশে।তার স্বামীও অত্যান্ত ভালো মনের জ্ঞানি একজন মানুষ। আমি দেশে আসলে উনার সাথে বসে বসে অনেক কথা হতো। সে যাই হউক,চাচি মারা যাবার পর চাচা কিছুদিন পরই অন্য বিয়ে করেছেন।চাচা চাচি আজ কেউই আর বেঁচে নেই।

রাজিয়া ভিজার বিয়ের উছিলায় বাড়ির  অন্নান্য বিয়ে হয়ে যাওয়া বোনদেরকে তাদের শ্বশুর বাড়ি থেকে নাইওরি হিসেবে আনা হয়েছিল। আমার বাপ চাচারা ছিলেন সাত ভাই।সাত ভাইয়ের সংসারে আমরা অনেক ভাই বোন।রাজিয়া ভিজার বিয়েতে সবার চোখে মুখে উপছে পড়া আনন্দ ছিল।আমার আপন বড় দুবোনের মধ্যে তো বড় বোন দেলাফ রোজ থাকতেন স্বামীর সাথে দিনাজপুর।ভাইসাব সেখানে তহশিলদারের চাকুরি করতেন।তাই তিনি আসতে পারেন নাই,কিন্তু আমার মেঝ বোন নুরজাহান নাইওরি হয়ে আসেন সেই বিয়েতে।নুরজানের ছেলে জাহাঙ্গীর তখন ছিল কোলে।ভাইসাব চাকুরি করতেন এনএসআই গোয়েন্ধা পুলিশ বিভাগে।তাদের বাড়ি ছিল মাইজদী বাজারের উত্তর দিকের প্রসিদ্ধ মজিদ হাজি বাড়ি।তিনিও এসেছিলেন সেই বিয়েতে।আমার শ্পষ্ট খেয়াল আছে তারা একদিন আগেই এসেছিলেন।

আমার বোন নুরজাহান ভালো গান করতে পারতেন।বাড়ির সব মেয়ে ছেলেরা সবাই পুরো রাত রাজিয়া ভিজাদের ঘরে গান বাজনা করে বিয়ের অনুষ্টানকে  উৎসব মুখরিত ও আনন্দময় করে তুলেছিলেন।তারা সবাই খাওয়া দাওয়াও করেছিল তাদের ঘরে। কিন্তু সকাল বেলায় দেখলাম এক আজব কান্ড।আমার যেই বোন নুরজাহানকে রাতে দেখলাম কেমন হাসিখুশি, সেই বোনটাকে দেখি সকাল বেলায় পাগলের মত বকাবকি করছে।বাড়ির সব মানুষ দাঁড়িয়ে তার দিকে অবাক বিশ্ময়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। বোনটি আমার পুরো বাড়ির উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছে নাচানাচি করছে।আবার কখনও কখনও কাউকে মারতে দৌড়ে যায়,কখনও বা এসে আমাকে কোলে তুলে আদর করছে,চুমো দিচ্ছে আর আবল তাবল বকাবকি করছে।আমি তো ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে আছি।মহিলারা ফিসফিশিয়ে  কেউ বলছে জ্বিনে পেয়েছে, কেউ বলছে পরীতে ধরেছে। পরী পেলে নাকি এমনি ভাবে নাচানাচি করে।আবার কেউ বলছে রাজিয়া ভিজার সৎ মা আমার চা্চি নাকি চিলের গোশতো খাইয়ে দিয়েছে।কেউ বলছে ধুতরা পাতা খাইয়ে দিয়েছে। চিলের গোশতো ধুতরা পাতার রস খাইলে নাকি মানুষ পাগল হয়ে যায়। আমার জানা নেই,বলতে পারব না।

বাংলায় একটি প্রবাধ আছে পাগলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায়,?আমার প্রিয় বোনটার অবস্হাও ঠিক সেই রকম হয়েছিল।সে আবল তাবল অনেক বকা বকছে আর বকছে। সবাইকে হুষিয়ার করছে,তোদের এখানে থানা হবে পুলিশ লাইন গারদ হবে।তোদের এখানে বড় বড় খাল হবে দীঘি হবে।দালান কোঠা হবে, ইত্যাদি।একবার হঠাৎ করে  সে উদাউ হয়ে গেল। চারিদিকে  সবাই খোঁজাখঁজি করে কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না।এমতা অবস্হায় আমার সেজ বোন নুর নেহার ছোট বোন মায়াকে কোলে নিয়ে আমাদের বাড়ির উত্তর দিখে কাঁদতে কাঁদতে খুঁজতেছিল।হঠাৎ করে আমার বোন নুরজাহান পাকা ধান খেত থেকে বের হয়ে এসে নেরুকে জড়িয়ে ধরে বললো, কিরে বোন তুই এমন করে কাঁদছিস কেন? আমি তো বড় দীঘিতে গোসল করতে গিয়েছি।তখনো কিন্তু একোয়ার হয়নি, জেলখানার বড় দীঘিটিও কাটা হয়নি।তুই জানিস না এখানে যে বড় একটা দীঘি হবে? এই কথাগুলি আমার সেজ বোন নেরু ঘরে এসে পরে সবার সামনে বলেছিল।পরে সত্যিই জেলখানার বড় দীঘি কাটানো হয়েছে সেখানে।

এর মাত্র অল্প কিছু দিন পরেই সিএন্ডবির বড় বড় হলদে রঙের বল্ডুজার এসে গাছপালা সব উপড়িয়ে ফেলে ছোট বড় টিলাটালা কেটে সব সমান করে ফেললো।সরকারি একোয়ারে পড়া বাড়ি ঘরের অধিবাসিরা ঘর দরজা খুলে যে যার মত এদিকে সেদিকে চলে গেল।এক বাড়ির মানুষ শত বাড়িতে বিভক্ত হলো।সে এক করুন পরিণতি।অনেকটা নদী বাঙা সর্বহারার মত।

হাজারে হাজার প্রায় লক্ষধিক তো হবে পিপড়ার মত শ্রমজীবি মানুষরা এসে দু-তিন মাসের মধ্যেই মাটি কেটে বড় বড় দীঘি খাল কেটে রাস্তাঘাট নির্মান করে মাইজদী নতুন শহরের পত্তন করে ফেললো।জেল খানর দীঘি পুলিশ লাইনের দুটা দীঘি এবং হাসপাতালের একটি দীঘির কাজ এক সাথেই শুরু হয়েছিল।বিল্ডিং এর কাজও একসাথে শুরু হয়েছিল।মাটিয়ালরা চলে যাবার পর শুধু  রাজ মিস্ত্রিও  শ্রমিকরা  বাঁকি কনস্ট্রাকসনের কাজ চালিয়ে গেল।জেলখানা পুলিশ লাইন আধুনিক সদর হাসপাতাল স্কুল আবাসিক ভবন সবকিছুই এক বছরের মধ্যে বেশির ভাগই নির্মান হয়ে গেল।কিন্তু চালু হলো না।বেশ কয় বছর ধরে এমনিই খালিই পড়েছিল সব।চালু হয়েছিল দেশ স্বাধিনের পর।এই সব বড় বড় বিল্ডিং এর ভিতর বর্ষার দিনে আমরা বল খেলতাম, লুকোচুরি খেলতাম।মাঠে গরু চেড়ে দিতাম। আর রয়ে যাওয়া গাছাগাছরা থেকে ফলমুল পেড়ে খেতাম।দুর দুর থেকে ছেলেমেয়েরা গরু ছাগল এনে চেড়ে দিত, আবার দুর্বা ঘাঁস তুলে সাথে করে নিয়ে যেত।

 এখানে কাজ চলার সময় আমার ছোট চাচা পাটোয়ারি এসে খুললো চা দোকান, তার পাশেই আরেক চাচা শফি সর্দার এসে খুললেন মুদি দোকান।আরো অনেক ছোটখাটো চা-নাস্তার দোকান খুলেছিল লোকজনে।গুলগুল্লা ডালের ভরা প্ররোটা  সাথে চা এগুলোই বানাতো বেশি।চলতোও ধুমছে।হাজার হাজার মাটিয়াল কাস্টমার মাটিতে বসেই খেত। রাতদিন কাজ চলতো।দুর দুর থেকে মাটিয়ালরা তো খড়ের ছালা নিয়ে এসে দুছালাকে একসাথ করে ঘর বানিয়ে স্হায়ি ভাবে থাকতো।রাতদিন কাজ চলতো।বড় বড় লাই-ওঁড়া ভরে তাদের জন্য ভাত পাকাতো বৃদ্ধ বয়সের এবং তরুন বয়সের ছেলেরা।একবার এক কান্ড ঘটেগেল।দেখি একটা ছেলেকে মাটিয়ালরা মারছে। ব্যপারকি? পরে জানতে পারলাম সেই ছেলেটা নাকি তরকারিতে তেলদাগার সরিসার তেলের পরিবর্তে লোহা গরম করে দাগা দিত। আর তেল গুলি নাকি ফের দোকানে বিক্রি করে দিত।ধরা পড়ার পরে এই অবস্হা।হাসির খোরাক হলেও ছেলেটা দুর্দান্ত ছালাক ছিলও বটে।
তাদের কাছ থেকে স্হানিয় লোকেরা বাল্টি ভরে ভাতের মাড় লয়ে গরুকে খাওয়াতো।আমরা স্হানিয় ছেলেরা গুরেফিরে এগুলো দেখতাম।বিকেল বেলায় মঠর সাইকেল করে শহর থেকে কন্ট্রাকটর সাহেবরা আসতেন টাকার বস্তা নিয়ে। মাটিয়ালের সর্দাররা হিসেব দিয়ে টাকা বুঝে নিতেন, সবাইকে বেঁটে দিতেন।আমরা চেয়ে চেয়ে দেখতাম টাকা গুনার দৃশ্য।
দেখতে দেখতে সবকিছু বদলে গেল।সুনসান  ছায়া সুনিবিড় মফস্বল গ্রামটা হয়ে গেল  আধুণিক  একটি নগর।বড় বড় বিল্ডিং,জেলাখানার বৃত্তওয়াল,আটাশ পিট চোওড়া কংক্রিটের পাকা রাস্তা।মাঝেমধ্যে মঠর যানের  ঠ্যা ঠ্যা শব্দ করে ছুটে যাওয়া,বেশ ভালো লাগতো অপূর্ব আনন্দ পেতাম। প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিসের সাথে পরিচয় হতে হতে আমিও যেন অল্প কিছু দিনের মধ্যে বেশ বড় হতে লাগলাম।আনন্দে উপভোগ করছিলাম সেই সোনালি শৈশবকে ।আজি এই মধ্য বয়সে এসেও শৈশবের সেই সৃতিগুলি আমার হৃদয় দর্পনে সিনেমার স্ক্রিনের মত বার বার ভেসে উঠে।

আরেকটা কথা না বললেই নয়,আমার এক দেড় বছর বয়সের সময় আমার এক পাঁয়ের হাঁটু পোড়া গিয়েছিল।সেই কথাও আমার শ্পষ্ট মনে আছে। আজো যেন চোখের সামনে ভাসছে।এক শীতের রাতে মা পাকঘরে চুলার সামনে একটা জলচৌকিতে আমাকে বসায়ে ধান সিদ্ধ করছিল।মায়ের সাথে একজন কাজের বেটিও ছিল।ঝিমানি এসে হঠাৎ করে চুলার ভিতরে খনখনে তুষের আগুনের মধ্যে আমার পাঁ ঢুকে গেল।কচি পাঁ সাথে সাথে পুড়ে পোসকা ধরে গেল।আমি কি কষ্ট পেয়েছি না পেয়েছি আমার মা আমার জন্য অনেক অনেক কষ্ট পেয়েছেন।মা আমার জন্য অনেক কেঁদেছেন।মাঁ এর সেই কান্না আজো আমার চোখে ভাসে।মা আমাকে নিয়ে একবার বড়দীগির পুর্ব পাড়ের পুরান হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।পরে মাখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন,আবার বাড়িতে কবিরাজের কাছেও চিকিৎসা করিয়েছেন।অনেকদিন পরে সেই পোড়া খত শুকিয়েছিল।

সরকারি এই সব দালান কোঠা হওয়ার পুর্বে আমাদের এলাকায় অর্থ্যাৎ এই পশ্চিম মাইজদীতে পাকা বাড়ি বলতে ছিল মাত্র চারটা বাড়ি। তাও আবার সেমি পাকা বা সার্ট দেওয়াওলা।একটা ছিল মানির বাড়ি,মানির বাবা অবঃ পুলিশ ইন্নিসপেক্টরের বাড়ি, উকশিায়ারের বাড়ি, এবং মজিদ কেরণীর বাড়ি।মানি ছিলেন বিধবা মহিলা। তার স্বামী নাকি ডাক্তার ছিলেন।তিনি মারা গিয়েছেন।আমরা দেখি নাই।
ঐ একোয়ারের বছর ছিদ্দিক ডাক্তার নামে আমাদের এক দুরের পড়শি এসে কমপ্লিট ছাদ ঢালাই দিয়ে পাকা বাড়ি নির্মান করেন।সম্পুর্ন ব্রিকের উপর সুন্দর এই বাংলো বাড়িটি বাইন্ডারি ওয়াল দিয়ে নির্মান করেছিলেন।কথিত আছে এই বাড়িটির উপরে যতটুকু নীচেও ঠিক ততটুকু।আমাদের চোখের সামনেই বাড়িটি নির্মিত হয়েছিল।বাড়িটি নির্মান হওয়ার পরে সাদা চুনের লেপন দেওয়ার পর ঝকমক করতো, চোক লেগে থাকতো। আমরা বাড়ির ভিতরে গুরেফিরে অনেক বার দেখেছি।

বাড়িটি নির্মানের বেশ কিছুদিন পরে ডাক্তার সাহেব রংপুর বা দুর কোন জেলাথেকে এসে এই বাড়িতে উঠলেন।যেদিন এসে উঠলেন সেই দিন রাতেই ডাঃ সাহেব হার্ট এটাক করে মারা গেলেন।পরে শুনেছি লোকে কহা বলা করতো, এই ডাক্তার সাহেব নাকি মানুষের ফিৎরা জাকাতের টাকা দিয়ে লেখাপড়া শিখে ডাক্তার হয়েছেন। কিন্তু এলাকার মানুষের দিকে কোনদিন ফিরেও তাকাননি।এমন কি সত্রুপক্ষের টাকা খেয়ে নাকি একজন মানুষকে বিষাক্ত ইঞ্জেকসান দিয়ে হত্যা করেছেন।সে কারণেই নাকি তার এমন অবস্হা।হায় হায়রে ডাক্তার সাহেব স্বপ্নের বাড়িতে এক রাতও গুমাতে পারেননি।সত্যমিথ্যা বলতে পারব না।সবি শুনা কথা।

ডাক্তার সাহেবের স্ত্রি এবং সন্তানরা ছিল টুকটুকে সুন্দর।দেখতে চালচলনে অবিকল ফরিনারের মত। দু ছেলে চার মেয়ে সবাই বড় হয়ে গেছে।মেয়েদের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়েছে বড় বড় পুলিশ অফিসার আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের সাথে।পরে ছোট মেয়েরও ধুমধামে বিয়ে হয়েছিল এখানেই। বাসায় স্হায়ি ভাবে থাকতো বড় ছেলে পারবেজ আর তার মা।পারবেজ ছিল টাউট  টাইফের মানুষ এলাকার মানুষকে মোটেই পাত্তা দিত না।শহরে কিছুদিন কন্ট্রাক্টরি করতো,হুন্ডা একটা চালাতো আর মদ খেত জুয়া খেলতো।একবার এক্সিডেন্ট হয়ে পাঁ ভাঙার পর হুন্ডা চালানো চেড়ে দিয়েছে সে।বাসায় পালতো জার্মানী শিফা কুকুর।দেখতে বাঘের মত।দেখলে তো দুরের কথা কুকুরের আওয়াজ শুনলেও ভয় বুক ধক ধক করতো।কুকুরটাকে অবশ্য শিকল দিয়ে বাসার ভাউন্ডারি ওয়ালেল ভিতর বেঁধে রাখা হতো। মাঝে মাঝে পারবেজ কুকুরটাকে বাহিরে এনে চেড়ে দিত। আমরা দেখে ভয়ে আতঙ্কিত হতাম।আজ সেই পারবেজ বাসার ছাদে মুরগি পালে,সম্পুর্ন একজন খালি  আদমি।


                                                
 

বুধবার, ১৬ মে, ২০১৮

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৫

সাগর কন্যা মাইজদী...( ১,২,৩,)

                                                                                                  

                        মাইজদী,মনিটর                                                                                                                               







মাইজদী জামে মসজিদ ও জিলা স্কুল,

 

                                 এক,
দুর্দর্ষ ক্ষীরদ সাগর জন্ম দিয়েছে তোমাকে,
আর তুমি জন্ম দিয়েছ আমাকে, হে আমার প্রিয় মা, সোনায় সোহাগায় ভরা, রুপসি মাইজদী গাঁ।মা- মা- আমার প্রিয় মা,
আমি আদর করে তোমায় ডাকি  মা,ও আমার প্রানের প্রিয়  মা।মাইজদী গাঁ,ও আমার মা- মা- মা রে- আমার প্রিয় মা---মাইজদী গাঁ---
সমূদ্রের ভয়াল উত্তাল পাত্তাল সময়ে জন্ম হয়েছে তোমার,
জন্মেই তুমি দেখেছ সাগর গর্ভে বিলীন হওয়া ভূলুয়ার পম্পে 
নগরির করুন দৃষ্য, কতো  স্তপতির সুনিপন নির্মান শৈলী,
কারুকাজ বাড়ি ঘর মসজিদ মন্দির, ফলাদি বৃক্ষ মানুষ পশুপাখির 
করুন আর্তনাদ!চোখের পলকেই তলিয়ে গেল অসহায় চোখেরই সামনে!
কিছুই করার ছিল না প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের বর্বরতার সামনে--

আর আমার জন্ম হয়েছে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল পাত্তাল দিনে।
হয় জান নতুবা মা এর মান,,এই মৃর্ত্যু নেশায় উন্মাদ প্রায় বাঙ্গালী জাতি,
এক তর্জনীর গর্জনে কেঁপে কেঁপে উঠে সমগ্র বিশ্ব!
শক্তিধর এটম বোমারা নিমীশেই হয়ে গেল নিঃস্ব!
মাথায় মাথায় রুমাল. হাতে হাতে বাঁশের লাঠি!
কে দমাতে পারে তাদের? বিশ্বে কোথায় আছে এমন কোন জাতি?
আমি জন্মেই দেখেছি নয় মাস রক্তক্ষয়ি যুদ্ধ!
কচি কচি চোখে দেখেছি রক্তে ধোওয়া বাংলার শ্যামল মাটি,আমি দেখেছি লাল 
কালছে ঝলসে উঠা আগুনের কুন্ডলি দিগন্তবদি,লাল লাল রক্তে ভেজা কালছে হয়ে উঠা 
সবুজ সতেজ পল্লব পত্রাদি।চারিদিকে লাশ আর লাশ, আকাশে শকুনের 
উল্যাস!
আর তুমি জন্মের পরে দেখেছ, এই সবুজের সমতটে,
সারি সারি গুবাক নাড়িকলে আম জাাম গাব আরমুজ 
কত না ফলাদি গাছ গাছালি,অনিন্দ সুন্দর এক ভূসর্ঘভূমি।
মৌরাণীর মত সানন্দে বসে বসে ঘ্রাণ নিয়েছ তুমি-
সাক্ষর খোরা কাইল্লা ঝিরা বিন্নি ধান আর কনক চুড়ার মোহময় সুগন্ধ।
আর আমাকে বড় করেছে মায়া মমতায় দুধে ভাতে---
ধন্য হলাম মাগো  ধন্য হলাম তোমার কোলে নিয়ে জন্ম,
মা - ও আমার প্রিয় মা মাইজদী গাঁ---


 
                         শৈশবে দেখা মাইজদী....
 আমার বয়স তখন কত ছিল ঠিক ভাবে বলতে পারব-না।তবে এতটুকু বলতে পারব , তখন টোনাটুনির গল্প কিংবা বাক্ বাকুম পায়রা, মাথায় দিয়ে টায়রা, পড়ার বয়স ছিল আমার।নিতান্ত শিশু হলেও দুর্দান্ত ছিলাম আমি।বড় জোর চার পাঁচ বছর বয়স হবে আর কি।চার পাঁচ বছর বয়সেই আমি মাইজদীকে অবলোকন কিংবা অনুধাবন করেছি মায়ের মত। শান্তশিষ্ট সুনসান ছায়া-মায়া ঘেরা সুনিবিড় স্যামল সবুজ সজিব কি অনিন্দ সুন্দর পরিবেশ।হরেক পাখির  কি মধুর সুরের মুর্চনা।লাল টুকটুকে শিমূল  মাদারের ফুল হলুদ ফনালু ফুল,বর্ষাকালের কদম ফুল,কলমি ফুল, রাস্তার ধারে ধারে হলকা ফুল সাফলাসহ নানা রঙের ফুলের কি অপূর্ব অর্চনা এঁকে থাকতো পানোরমায়।শৈশবের দেখা অনেক ফুল ফলাদির নাম এখন আর মনে করতে পারছিনা।আমরা ভোরে হৈহৈল্লোর করে ফুলের উৎসব করতাম।কার আগে কে ফুল তুলে আনবে, সেই চেষ্টায় সবাই সদা প্রস্তুত থাকতাম। সাঁফ ঝোঁকের ভয়ডর তো মোটেই ছিলনা। একবার কদম ফুল পাড়তে গিয়ে ঠাল ভেঙে কদম গাছ থেকে পড়ে আম গাছে আঁটকে যাই। একটু ছরা লেগেছে, রক্ত ঝরেছে কিন্তু ভাগ্যিস হাত পাঁ ভাঙেনি।সেই সময় আমাদের এই মাইজদীর পরিবেশ প্রকৃতি এমনই দৃষ্টি নন্দন মধুর ছিল যে মনে হত চারিদিক থেকে যেন হাত বাড়িয়ে আদর দিচ্ছে অখল মায়ের মমতা। 
আমাদের দেশ তখনো পাকিস্তানের অখন্ড অংশ।পূর্ব পাকিস্তান নামে এদেশ খ্যাত হলেও স্বাধীনতার আন্দলনে উত্থাল স্বদেশ আমার।এই দুর্বার উত্থালের মধেই জন্ম হয়েছে আমার।এই মাইজদী গাঁ-ই জন্ম দিয়েছে আমাকে।ছয়দপা দিয়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের সাথে প্রায় ঘাঁটছাট বেঁধেই ফেলেছেন।স্বাধীনতার ডাক নাম সায়ত্বশাসন, বঙ্গবন্ধু ছয় দপার মাধ্যমে ঘোষনা করে দিলেন।ছয়দপার দাবিতে আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার দুর্বার আন্দোলনের কথা বুঝার বয়স না হলেও উনসত্তরের গনউর্ভ্যত্থান আমি দেখেছি, সত্তরের নির্বাচনে নৌকার গন জোয়ার দেখেছি। সত্তরের জলউচ্ছস গোর্কি আমি দেখেছি।স্বাধীনতার জন্যে জীবন বাজি যুদ্ধ আমি দেখেছি। বুঝার যতেষ্ট  বয়সও তখন আমার হয়েছে।জন্মের পরই আমি আন্দোলন সংগ্রাম যুদ্ধ দেখেছি। জন্মের কিছু দিন পরই আমি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিখেছি।আমি স্বাধিনতা দেখেছি আমি যুদ্ধ দেখেছি। স্বাধীনতার জন্যে অনড়  মুক্তিযোদ্ধার প্রাণপণে লড়াই দেখেছি।রাজাকার আলবদরের গাদ্দারি দেখেছি।হত্যা ধর্ষন লুটতরাজ  আগুন সন্ত্রাস দেখেছি।আমি রক্তাক্ত মানুষের তাজা তাজা লাশ দেখেছি।জন্মের পরই দেখেছি প্রিয় স্বদেশ আমার মুক্ত স্বাধীন।পৃথিবীতে যে জাতি দেখেছে স্বাধিনতার মুখ, একমাত্র তাদের ঘরেই ধরা দেয় পৃথিবরি সকল সুখ।কিন্তু আমরা এক হতভাগ্য জাতি, স্বাধিনতার মুখ দেখেছি বটে সূখ দেখিনি কভূ। যারা স্বাধিনতার যুদ্ধ দেখেনি,তারা বড়ই হতভাগ্য, তাদের জন্যই আমার এই উদ্দেগ বা প্রয়াস।আমি বদলে যাওয়া মাইজদীর গল্প বলতে বসেছি।আমি বদলে যাওয়া বিশ্বের গল্প বলতে বসেছি।আমি বদলে যাওয়া মানুষের কথা বলতে বসেছি।আমি আমাদের মহান স্বাধিনতা যুদ্ধের গল্প বলতে বসেছি।
 তখন আমি বাড়ির বড় ছেলে মেয়েদের সাথে বই পুস্তোক সিলেট পেন্সিল ছাড়াই স্কুলে যাওয়া শুরু করি।পরনে থাকতো ইলেস্টিক লাগানো চেক কাপড়ের হাপপেন্ট গায়ে রেডিমেট জামা। কখনো যেতাম খোনার বাড়ির দজার স্কুলে,আবার কখনো যেতাম পুরান পুলিশ লাইন প্রাইমারী স্কুলে।মাইজদী পুরান জেল খানার মেইন গেইটের বাম পাশে দেয়াল ঘেরা তজ্জার ছাউনী ভিটি পাকা ছিল স্কুল ঘরটা।গনি হুজুর ছিলেন আমাদের বিখ্যাত টিস্যার।আমি বাড়ির  চাচাত  ভাই মোস্তফা ও বেলালের সাথে সিলেট পেন্সিল ছাড়াই যেতাম।পড়তাম ইনপানে।খাটো করে মুখ ভরতি কাঁচাপাকা লম্বা দাঁড়িওলা  গনি হুজুর এসে আমাদেরকে মুখে মুখে সতকিয়া পড়াতেন। খুবি ভালো ছিলেন গনি হুজুর।শিশুদেরকে খুবি আদর করে পড়াতেন।হয়তবা পুলিশের ছেলে মেয়ে বলে।আজকাল তো হুজুররা আজরাইলের মত মারে।

আর মাদরাসা বলতে আরবি পড়তে যেতাম খোয়াজ খাঁর বাড়ির দজায় এবং মাঝে মধ্যে যেতাম লাতুর বাপের বাড়ির দজায়।এই বাড়িটাকে অবশ্য কবি রত্ন গো বাড়ি বলে।  লাতুর বাপের বাড়ির দজায় কম যেতাম, কারণ সেখানের মুলবি সাহেব ভিষন মারতো ।কারণে অকারণে সবাইকে লাইন ধরায়ে নোয়ায়ে এক সাথে ছর্রা বাড়ি দিত সবার পিটে। মারতো কমবেশি সবখানেই ।স্কুলেও মারতো। গরুর মত মারতো। একবারে পিটের ছাল তো উঠতোই,হাতের আঙ্গুল এবং হাতও ভেঙ্গে দিত। আজ কালও মারে।কচি কমল মতি ছেলে মেয়েদেরকে এভাবে মারা কি ঠিক?উত্তর হবে মোটেই না।ইউরোপে দেখছি মোটেই মারেনা।
দজায় বলা এ কারণে তখন মাদরাসা ঘর  বলতে আজকের মত কোন পাকা বা কাঁচা ঘর ছিল না। আমরা বাড়ির আঙ্গিনানায়  উঠানে দাঁড়ি বিছায়ে বসে পড়তাম।দাঁড়ি এবং কিছু চাউল বাড়ি থেকেই আমরা প্রতিদিন নিয়ে যেতাম মুলবি সাহেবের জন্য।ওটাকে মুটচালাও বলা হতো।কেই কেই দু-চার আনা পয়সাও নিয়ে যেত। আজকের মত তখন পাড়ায় মহল্লায় বা এলাকায়  কেজি স্কুল বা মাদরাসা মসজিদ তেমন একটা  ছিলনা।এখন মাদরাসা মসজিদ যেমন হয়েছে, তেমন মুখোশধারি মুসলমানের সংখ্যাও বেড়ে গেছে।মুলুবি সাহেবরা মিম্বারে বসে ওয়াজ করে বলে দান খয়রাত করা হলো এমন।যেন ডান দিয়ে দান করলে বাম হাত জানতে পারেনা।আবার তারাই মাইকে বলে দান করুন, করুন মসজিদের জন্য অমুক অমুক মিসকিনের জন্য কিছু দান খয়রাত করুন।আল্লাহ ছওয়াব দিবে।
খোনার বাড়ির সামনের স্কুলটা আমাদের বাড়ি থেকে বেশি দুরে ছিলনা,  অদুরেই ছিল । আমাদের এলাকার বেশির ভাগ ছেলে মেয়ে এই স্কুলে লেখাপড়ার সূত্রপাত করেছে।  এই স্কুলে আমার যাওয়া আসা খুবি কম পড়তো ।কারণ এই স্কুলে আমাদের ছোটদের জন্য বসার তেমন কোন ব্যবস্হা ছিল না।বড়ই গাছের নিছে উত্তপ্ত রোদের মধ্যে ডাবের মালা অথবা দুর্বা ঘাঁসের উপর বসায়ে পড়ানো হতো।তাছাড়া স্কুলে যাবার মত ভালো রাস্তাঘাটও ছিলনা।মানুষের উঠান দিয়ে ছায়া লতাপাতা গেরা দুর্গম জঙ্গল  গাছগাছালী বাগবাগিছার ভিতর দিয়ে ভাঙা পথ  কাদাপানি মাড়িয়ে যেতে হতো।অনেক সময় ভয়ে বুকটা ধক্ ধক্ করে কাঁপতো।যাবার পথে আবার স্হানীয় দুষ্ট ছেলেরা আমাদের বাড়ির বড় বোনদেরকে গাছের কাঁচা ঠাল ভেঙে মারদোর করতো, ভয়ভীতি দেখাতো। আমরা কিছুই বুঝতাম না।কেন যে তারা  অকারণে আমার বড় বোনদের মারতো। আতঙ্কিত হয়ে অবুঝের মত শুধু কাঁদতাম আমরা ছোটরা।
যে সমস্ত ছেলেরা আমাদের বড় বোনদের উপর খামাকা এমন অত্যাচার নিপিড়ন করছে, আমরা বড় হয়ে তাদেরকে অনেক মেরেছি। শৈশবের সেই খোবে দুঃখে ইচ্ছেমত মেরেছি সেই কাঠুরিয়া দুধার ছেলেকে।কালা চোরার ছেলেদেরকে।উচিত শিক্ষা দিয়েছি।তারা সবাই ছিল দিন মুজুর আর কাঠুরিয়া এবং ভিখারিও চোরের পোলাপাইন।
আমি বেশি যেতাম মাইজদী পুরান পুলিশ লাইন প্রাইমারী স্কুলে। পুরান জেল খানার পশ্চিম পাশে দেয়ালের সাথেই স্কুলটা ছিল। ভিটি পাকা তর্জ্জার ভেড়া ও ছাউনির ঘর।তার পশ্চিমে ছিল একটা দীঘি। দীঘির চারি পাড়ে ছিল বড় বড় নাড়িকেল গাছ। মাঝে মাঝে দুএকটা আম ঝাম গাছও ছিল।মাঝে মাঝে কংক্রিটের সফেদ ব্যঞ্চ বসানো ছিল।প্রত্যেক গাছের গোড়ালিতে চুনের লেপন করা ছিল।দীঘির উত্তর দক্ষিন এবং পশ্চিম পার্শে ছিল পুলিশদের থাকার ঘর আর ব্যরাক।দক্ষিন পাড়ে ছিল বড় একটা ট্রেনিং পিল্ড।সেখানে নতুন রিক্রুটরা সকাল বিকাল ট্রেনিং করতো। আমরা পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম।প্রত্যেক ঘরের সামনে লাল ইটের ডমেনি করে ফুলের বাগান করা হয়েছে।কি অনিন্দ সুন্দর সাজানো ঘোচানো এক মনোরম পরিবেশ ছিল পুরো এলাকাটা।আমরা স্কুল ছুটির পর খেলা ধুলায় আনন্দে মেতে উঠতাম। খেলাধুলা করতে করতে বাড়ি ফিরতাম।কি সুন্দর ছিল সে সব অতসি রঙের দিন গুলি।সৃতির দর্পনে ভেসে উঠলে আজো নস্টাল জিয়ায় পেয়ে বসে।বড় খয়া খয়া লাগে।
 আমার কাজিন মুস্তোফা আর সম্পর্কে ভাতিজা বেলাল যেত পুলিশ লাইন প্রাইমারী স্কুলে। তারা দুজন বয়সে আমার একটু বড়। তারা ক্লাশ টুতে পড়তো । আর আমি পড়তাম ইনফানে।এখনকার কেজি আর কি।পুলিশ লাইন স্কুলটা আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় দু কিঃমিঃ দুর হবে।তখন কোন পাকা রাস্তাঘাট ছিল না। নতুন পুলিশ লাইন জেল খানা আধুনিক সদর হাসপাতাল তখনো এই সব কিছুই গড়ে উঠেনি।আমাদের বাড়ির কাছারি ঘরের সামনে দিয়ে ৬-৭ বা ১০  ফুটও হতে পারে চৌড়া একটা কাঁচা সরকারি রেকর্ডিং রাস্তা এঁকেবেঁকে মজিদ কেরানি বাড়ির সামনে হয়ে(বর্তমানে হাই সাহেবের বাড়ির) লতিফের বাড়ির সামনে দিয়ে বর্তমান পৌর ভবনের সামনে  গিয়ে মাইজদীর বুকের উপর দিয়ে বহে যাওয়া সোনাপুর- চৌমুহানি পিজ ডালা রোডের সাথে গিয়ে মিশেছে।এই পাকা রাস্তাটির পুর্ব পার্শে ছিল সার্ট দেয়াল টিনের থানা ঘর।থানা ঘরের উত্তরের ছালের  সাথে সব সময় নতুন নতুন হাঁড়ি ঝুলায়ে রাখা হতো।সেদিকে একটু ঝোঁপঝাড়ও ছিল।একদিন কৌতুহল বসত বাবাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। বাবা থানার পিছের ছালের সাথে যে নতুন নতুন হাঁড়ি ঝুলায়ে রেখেছে কিসের জন্য।বাবা যা বললো শুনে ভয় ধরে গেল ভিতরে। বাবা বললেন, মরা মানুষের কলিজা গুর্ধার আলামত ডাক্তারি পরিক্ষারর জন্য আলামত হিসেবে রাখা হয় সে পাতিলে। থানার উত্তরে ছিল পুলিশ লাইন। ট্রেনিং এর মাঠ জেলখানা স্কুল এবং থাকার ঘর ইত্যাদি।
আমাদের বাড়িটা ছিল পশ্চিম মাইজদীতে। নতুন পুলিশ লাইনের সাথে এবং জেল খানার দক্ষিন দিকের বাড়িটাই আমাদের বাড়ি।বর্তমান আধুনিক পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড এর মধ্যে পড়েছে।আমরা বাড়ির চাচাতো জেটাতো ভাইয়েরা  এখন অনেকেই পুরান বাড়ির সামনে নিউ জেল রোডের দুপাশে নতুন নতুন দালান বা পাকা ঘরবাড়ি নির্মান করেছি।কেউ কেউ আবার অন্যত্রও চলে গেছে। আমাদের পুরান বাড়িটা ইসলাম হাজি বাড়ি নামেই প্রষিদ্ধ ছিল।আমার পরদাদা ইসলাম হাজি তৎকালে ৩২ কানী জমিনের উপর বড় বড় তিনটা পুকুর কাটিয়ে এই বাড়িটা বেঁধেছিলেন।
আমার পর দাদা ইসলাম হাজি তিনি নাকি ৫টা বিয়ে করেছিলেন, তন্মধ্যে এক স্ত্রি ছিলেন নিঃসন্তানা বা বন্ধা। বাঁকি চার স্ত্রির ঘরে জন্ম নিয়েছেন অনেক সন্তান সন্ততি।পাঁচ বিবিকে তিনি এই বিশাল আকারের বাড়ির পাঁচ ভাগে ভাগ করে পাঁচটি ঘর উঠায়ে পাঁচ বিবিকে পাঁচ বাড়িতে রাখতেন।কিন্তু বাড়ির বড় একটি অংশই  ছাড়া পড়ে থাকতো।যাকে আমরা বলতাম ছাড়া বাড়ি। সেখানে ছিল বড় একটা  ছাড়া পুকুর। পুকুরের দক্ষিন পাড়ে ছিল গোরস্হানের মত বড় কবরস্হান।সেখানে ছিল বড় বড় তুলাগাছ অশ্বত দেবদারু, আর ভয়ঙ্কর জঙ্গল।সে সব গাছে সাঁপ ঝোঁক ভূত বানর কত কিছুই না থাকতো।বড়দের মুখে এমন কি ভূতে ধরা রৌশনির মুখে এমনটাই শুনেছি।আর ছাড়া পুকুরে তো থাকতো ছলি, থাকতো চুলওলা গজার মাছ।বেশির ভাগ সময় তো উদুম হয়ে থাকতো বিশালাকায় পুকুরটা।উদুমের উপর দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারতো।উদুমের ভিতর বক আগুনি বক ছবা সারস পাখিরা বাসা বাঁধতো। বাচ্ছা ফুটাতো।বাচ্ছা নিয়ে সবাই ঝাক বেঁধে মুরগীর মত টক টক কট কট করে আদার খেত। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখতাম।দিনের বেলায়ও   ছাড়া বাড়িতে যেতে ভয়ে গা ছম ছম করতো। গায়ের পশম সাঁঝারুর কাঁটার মত সজাগ দৃষ্টিতে খাড়া হয়ে যেত।তবুও আমরা দল বেঁধে যেতাম। এখন আর সে সবের লেশ মাত্রও নাই।আমাদের বাড়ির উত্তর দিকটা সরকার একয়ার করে নিয়ে গেলে অনেকেই এসে ছাড়া বাড়িতে ঘর বেঁধেছে।ছাড়া পুকুরের পাড় দিয়ে আমাদের পশ্চিম বাড়ির লোকজন আসা যাওয়া করতো।সে পথ দিয়েই আমরা ছাড়া বাড়ির দিকে যেতাম।
আমি সেই বংশের চতুর্থ জেনেরেসান।আজ কয়েক শত হবে এই বংশের সদস্য।গুনে কুল করা যাবেনা। শুধু আমরা চাচাতো ভাই বোনই হব শতাধিক।তারপর আছে আমাদের সন্তান সন্ততি নাতি-নাতনি।সত্যি কথা বলতে কি আমি এখন আমার বংশের প্রায় আশি ভাগ সদস্যকে চিনিনা।মাঝেমধ্যে ওরা কেউ কেউ নিজেরা এসেই পরিচয় দেয়,আমি শুনে বিশ্মিত হই।
আমার পর দাদার পুর্ব পুরুষরা ছিলেন নাকি জোগারি বাড়ির লোক।বাবার মুখে শুনেছি তারা মিঝি বংশের লোক ছিলেন।কিন্তু তাদের নামের সাথে মিঝি বা জোগারি নামের কোন পদ পদবি ছিল না।সেটা আমার বোধ গম্য ছিল না । আমার সব সময়ই একটা সন্ধেহ থেকেছে। কারণ জোগারি বাড়ির লোকরা বেশির ভাগই গরিব বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক, কিন্তু আমার পর দাদা এত বড় লোক হলো কি করে। সেই জমানায় তিনি হজ্ব করেছেন বত্রিশ কানি জমিন খরিদ করে নতুন বাড়ি নির্মান করেছেন।আরো দরুনে দরুনে নাল জমিন ছিল। এত টাকা তিনি পেলেন কোথায়? সে যাই হউক, জোগারি বাড়িটা হলো বর্তমান হরমুজা পলটি ফারমের ঠিক পশ্চিম দিকের বাড়িটা।
 এক সময় বৃহত্তম নোয়াখালী জেলার প্রাণ কেন্দ্র ছিল আমাদের এই মাইজদী শহর।বলা যায় বৃহত্তম নোয়াখালীর রাজধানী।এই তো সেদিন ফেনি ছাগল নাইয়া, লাক্সিমপুর সহ দুরদুরান্ত থেকে লোক জন এসে মাইজদী শহরের কোর্ট কাছারি দোকান পাট মুখরিত করে তুলতো।ঝড় উঠতো চা-এর কাপে, কিংবা খাবার প্লেটে।বড় দীঘির পাড়ের মাঠে দুর্বা ঘাঁসের প্রাণ যেত মানুষের পাঁয়ের চাপে।মাইজদীকে আপনি শহর নগর গাঁ গেরাম মফস্বল যা কিছুই সন্বোধন করেন না কেন ভূল হবে না। মাইজদীর একটি স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে। এক সময় সুধারাম থানা শহর নামেও মাইজদী খ্যাত ছিলে। এখানে প্রশাসনের কোর্ট কাছারি থাকার কারণে মাইজদী কোর্ট নামেও খ্যাতি লাভ করে। আবার এক গল্লির শহর নামেও খ্যাতি ছিল বেশ।
মাইজদীকে কেন মাইজদী বলা হয়?
মাইজদীর নাম করন কেন মাইজদী করা হয়। মাইজদীর সন্তান হিসেবে আমি মাইজদীর ইতিহাস এখানে বলার চেষ্টা করছি।হারিয়ে যাওয়া সন্তান যেমনি মির্ত্যুর আগ পর্যন্ত তার মাতা পিতাকে খুঁঝে বেড়ায়, আমিও তেমনি খুঁঝে বেড়াচ্ছি আমার গুনবতি মা সাগর কন্যা মাইজদীকে।যদিও আমি কোন ইতিহাসবেত্তা নয়। 
 এই মাইজদীর ধুলোবালি গায়ে মেখে, কতো ইকিড়ি মিকিড়ি খেলা খেলে আমার সোনালি শৈশব কেটেছে এই অনিন্দ সুন্দর মাইজদীর বুকে। লাটিম খেলা গুলোন ছোড়া,চোর ডান্ডা খেলা, বাঁশের চোঙার পিস্তল মারা, মাটির মার্বেল খেলা, খালবিল ডোবা ডাবায় ডুবোডুবি দপাদপি, সাঁতার কাটা, গাছে গাছে বাঘ ছাগল খেলা বন-বাদারে গুরেফিরে ফলমুল খাওয়া, ঘুঘু সালিকের ছানা পোষা, নলিনি ডোবায় সাপলা সালুক তোলা,  কদম ফুলের মেলায় সেকি আনন্দ উৎসবের নস্টালজিয়ায় আজো আমায় কাঁদায় হাঁসায়।হাঁসায় যত টুকু তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি কাঁদায়।জানিনা এই অজানা অচেনা শহরে পলাতক সৃতিগুলি আজ বারবার আমার হৃদয় দর্পনে কেন উদিত হচ্ছে? আমি ভূলতে চাইলেও ভূলতে পারি না এই মাইজদীকে।পলাতক সৃতি গুলি বারবার উথলি উঠে হৃদয় পটে, আমায় কাঁদায় কষ্ট দেয়।
সে দোয়েল কোয়েল সালিক স্যামা ঘুঘু বুলবুলি,  টিয়া তোতা শালিক খঞ্জনা কাকাতুয়া, ছোট ছোট টুনটুনির সুরের মুর্চনা, আজানের সেই সুমধুর ধ্বনি,অনন্ত ছঁতি বাড়ির পুজা অর্চনাতে ডাক ডোলকের বাজনা,নিশাচর কুকুরের ঘেউ ঘেউ খেক শিয়ালের হুক্কাহুয়া চিৎকার, চাঁদনী প্রসার রাতের জোসনা বিলাশ জোনাকির মিটমিট আলোর উৎসব কি কোনদিন ভুলা যায়।?কি অপুর্ব সুন্দর ছায়া মায়ায় মমতায় শান্ত-শিষ্ট- স্নিগ্ধ মনোরম পরম পরিবেশ ছিল আমাদের এই মাইজদী গাঁ। আজো আমাকে আন্দোলিত করে রোমঞ্চিত করে।পুরো গ্রামটাই ছিল যেন আস্তা একটি ভূসর্ঘ। কিংবা এডেন উদ্যান।
কি অবাক বিশ্ময়! নিয়তির কি নির্মম পরিহাস! মাইজদী এখন আর সেই আগের মত নেই। দেখতে দেখতে মাইজদী আজ বদলে গেছে।আমি যেমন ফুটফুটে শিশু থেকে এখন মধ্য বয়সি  হয়েছি, মাইজদী যেন আমার মত আজ মধ্য বয়সি কোন অবলা নারি।আগে যেখানে ছিল সবুজ সজিব স্যামল সর্ঘিয় আবেশে ঢাকা।আজ সেখানে কংক্রিকেটের উঁচেল উঁচেল দালান আর শক্ত শক্ত  পাথরের নির্মম পাঁচিল।আগে যেখানে ছিল রোমাঞ্চিত প্রাণের স্বতস্ফুর্ত স্পন্দন। আজ সেখানে প্রাণ আছে কিন্তু কোন স্পন্দন নেই, রোমান্স নেই।।পাখির সুরের মুর্চনা নেই।মাইজদী যেন আজ কেমন বিষন্নতাময় গোমরা মুখি ফ্যাল ফ্যাল নয়নে চেয়ে আছে আমার দিকে।মাইজদী যেন আজ আমার কাছে অচেনা অজানা একটি মেট্রপলিট কসমোপলিট শহর। আর আমি যেন তার কাছে আফ্রিকার জঙ্গল থেকে আসা কোন আজনবী।প্রাণ কেঁদে উঠে মাইজদীর এমন বিবর্ণ চেহারা দেখে।নিজের অজান্তেই আমি হাউমাঁউ করে কেঁদে উঠি।ঝাপসা ঝাপসা নয়নে অবলোকন করি মাইজদীকে।অর্ধশতাব্দিরও বেশি সময় ধরে যা অবলোকন করে আসছি।মাইজী এখন আর আমার সেই প্রিয় মাইজদী গাঁ নেই। মাইজদী আজ একপটি পাষান নগরি,লোকে বলে সিটি কর্পোরেশন।আজ বিষন্ন মনে তাহাই শেয়ার করতে চাচ্ছি।যদি স্বরীর ঠিক থাকে বিষদ বর্নণা করবো ইনশআল্লা!দৃষ্টি রাখুন আগে।


মাইজদী বড় দীঘির পাড়ের পার্ক



 
 
                                                  (  দুই)
                সবুজ বৃক্ষের শহর মাইজদী--
বন্ধুরা আমি একাত্তর সালের দু-তিন বছর আগের কথাই বলছি।সে কালের মাইজদী আর আজকের মাইজদীর মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান। সেই সময় মাইজদী শুধু নোয়াখালী সদরের হৃদয় ছিলনা, বরঞ্চ বৃহত্তম নোয়াখালী জেলার প্রাণকেন্দ্র ছিল এই তীলত্তমা মাইজদী শহর।মাইজদী ছিল নোয়াখালী বাসীর বিলাপ বিনোদন আনন্দ বেদনা উচ্ছাস উৎসবের পুত প্রবিত্র পরম শান্তির স্নিগ্ধাবেশের পরম দেশ।
আমি প্রায়ই  গর্ব করে বলি আমি মাইজদীর সন্তান। আমি হাজার বছর জনম নিয়ে শিশুর মত দুলতে চাই এই মাইজদীর কোলে।এই মাইজদীর ধুলোবালি গায়ে মেখে খেলতে চাই অবিরাম। আই লাভ মাইজদী।
মনের আবেগে আমি মাঝেমধ্যে গুন গুন করে গেয়ে উঠি---                                                                                         আগে দে মা মোরে এক মুঠো মাটি, তার পরে দিসরে মা ভাত,
 মাগো তোর স্যামল মাটি গায়ে মাখি একটুখানি খেলে আসি সাথিদের সাথ।
 
শৈশবের দেখা মাইজদীর কথা মনে পড়লে আজো চোখ দুটি মোটা মোটা নোনা জলে ভরে উঠে।সৃতিগুলি আমাকে কাঁদায় অবোধ শিশুর মত।আমি কাঁদি।বর্তমানে নিউ জেল রোডের পশ্চিম পার্শে এবং নিউ জেলখানার দক্ষিন পার্শে দেয়াল ঘেঁষা বিশাল বাড়িটিই আমাদের পুরান বাড়ি।ইসলাম হাজি বাড়ি নামে খ্যাত বাড়িটি বর্তমান পৌর সিটি কর্পোরেশনের এক নাম্বার ওয়ার্ডের অংশ। অপবাদকারীরা আমাদের বাড়িটাকে হাজি বাড়ির বদলে সিল বাড়ি হিসেবেও দুর্নাম রটিয়েছে।তারও একটা ঐতিহাসিক কারণ আছে। বাড়ির সাহেবি বা জমিদার শ্রেণীর এক দাদা নাকি তার নিযুক্ত বেতন ভূগি নাপিত আসতে দেরি হওয়াতে তাকে মেরে ক্ষুর কেঁছি পুকুরে ফেলে দিয়েছে।সেই থেকে ঐ নাফিত সিল বাড়ি নাম করন করেছে বলে বড়দের মুখে শুনেছি।সে দাদার নাম ছিল নাকি আরিফ। তার নামেই আরিফ সিলের বাড়ি বলে ডাকতো।তিনি ছিলেন আমাদের পশ্চিম বাড়ির দাদা।সত্যি কথা আমার জ্ঞানবুদ্ধি হবার পর থেকেই দেখে আসছি আমাদের বাড়িতে চিটিপত্র বা মানিঅর্ডার সবকিছই ইসলাম হাজি বাড়ি নামেই আসতো।বর্তমানে তো আমরা ইসলাম হাজী জামে মসজিদ নামে একটি মসজিদও নির্মান করেছি।  আবার কেউকেউ বলে আমাদের বাড়ির মানুষজন একটু গাঁড়ুয়া টাইফেরও ছিল বিদায় সিল বাড়ি ডাক পড়েছে।
সে যাই হউক আমাদের বাড়ির উত্তর পাশে ছিল মালিদের ছাড়া বাড়ি।উঁচু উঁচু টিলা পাহাড়ের মত দীর্ঘ ছাড়া বাগান।বড় বড় গাছগাছালী ঝোঁপঝাড় জঙ্গলে ভরা। শিমুল, শীলকরি, আম ঝাম কত রকমের গাছগাছালি। দিন দুপুরেও ঘা চম চম করতো সেদিকে যেতে। তবু আমরা যেতাম বাড়ির দুষ্ট ছেলের দল।টিলার দক্ষিন পাশে ছিল বড় একটি হিঙ্গুরইয়া(জল ফলের) পুকুর।ঠিক আজকে যেখানে লাশ খানার লোহার গেট সেখানে। এই পুকুরে কলাগাছ ভাসিয়ে জলফল তুলে খেয়ে, টিলার বাগান থেকে চিনি মন্ডল বুনো জঙ্গলি ফল খেয়ে কেঠেছে আমার শৈশবের মুখর দিনগুলি। একবার জলফলের লতা পেঁছায়ে ডুবে মরতে বসেছিলম। সাথিরা অনেক কষ্ট করে আমাকে বাঁচিয়েছিল সেদিন।
আমাদের বাড়ি থেকে উত্তর পুর্বকোনে ছিল মালিদের বাড়ি।ঠিক আজকে যেখানে পুলিশ লাইন হাসপাতাল সেখানে।মালি বাড়ির উত্তর পাশে ছিল বিশাল কাইল্লা বাড়ি। মালি বাড়ির একটু পূর্বেই ছিল আবিদ রাজের বাড়ি।মালিদের ছাড়া বাড়ির  উত্তর দিকে ছিল ঠাওরান বাড়ি, ও দুল্লুফিদের বাড়ি।ঠিক আজকে যেখানে জেলখানার বিশাল দীঘি।দীগির পূর্ব পাশে এখনও ঠাওরান বাড়ির পাকা কবরের নিসানা  আছে।এই কবরের পশ্চিম পাশেই ছিল ঠাওরান বাড়ির বড় একটা পুকুর। সেই পুকুরের পাড়ে ছিল অনেক গুলি পেয়ারা জাম ও কাজমের গাছ।আমরা ছোটরা অনেক সময় সেই গাছ থেকে পেয়ারা জাম কাজম পেড়ে খেতাম মনের আনন্দে।
আমাদের বাড়ির উত্তর দিকের বাড়ি গুলির কথা বলার আমার প্রধান উদ্দেশ্য হলো,এগুলি ছিল আমাদের নিকটতম প্রতিবেশি বা পড়শিদের বাড়ি।সেই সময় পড়শি প্রতিবেশিদের কে মনে হতো সবাই যেন একি পরিবারের সদস্য, সবাই যেন পরস্পরের অতি আপন জন।। সবার মাঝে কি অসাধরণ মিল মহব্বত আন্তরিকতা ছিল।আজকাল পড়শি তো দুরের কথা নিজ পরিবারের মধ্যেও আন্তরিকতা নাই।

দ্বিতীয়ত এই বাড়ি গুলি তৎকালিন পাকিস্তান  সরকার একোয়ার করে নিয়ে হলুদ বোলডোজার দিয়ে গুড়ো করে দিয়েছে সব, মাত্র অল্প কয়দিনের মধ্যে।এক কাইল্লা বাড়ির মানুষ একশ বাড়িতে বিভক্ত হয়েছে।ঠাওরান বাড়ির মানুষরা কেউ উঠে নতুন জেলখানার উত্তর পাশে ঘর তুলেছে।দুল্লুফিরা চলে গেছে বজরায়।মালীরা কে কোথায় গিয়েছে তার কোন হদিছ নাই।সবাই সিত্তীছান হয়ে গেছে নদী ভাঙা মানুষের মত শুধু   এই একোয়ারের কারণে।একোয়ার করে এখানে নির্মান করা হয়েছে জেলখানা, পুলিশ লাইন আধুনিক সরকারী হাসপতাল।নদী ভাঙার মত ভেঙেছে কারো বসত বাটি কারো ধানি জমি, আর এই এলাকার মানুষ গুলি হয়েছে উদভাস্তু সর্বহারা।সরকার সে সময় এই সব সর্বহারাদেরকে প্রতি কানি জমিনের দাম দিয়েছে মাত্র এক দেড় হাজার টাকা করে, তাও আবার তিন চার কিস্তিতে।


আমাদের বাড়ির ঠিক উত্তর পশ্চিম কোনে ছিল চৌধুরি মিঞার বাড়ি। আমরা বলি উত্তর বাড়ি।চৌধুরি মিঞা জমিদার ঘোছের মানুষ ছিলেন।তার নাকি এক ঘোঁড় দৌড়ের জমিন ছিল।আমার বাবার সাথে দোস্তি ছিল চৌধুরি মিঞার। এই চৌধুরি মিঞার কাছ থেকে বাবা অনেক জমিন কিনেছেন।ঔ জমিন গুলিকে আজো আমরা বলি চৌধুরির খেত।তার বাড়ির দজায় ইটবাটা ছিল।তার পাশে নামাজ পড়ার জন্য পাকা সডান ছিল।আমি বাবার সাথে প্রায়ই তাদের বাড়ি যেতাম। চৌধুরি মিঞাকে দেখেছি, খুব হাসি খুশি মানুষ ছিলেন।বাবার মত সুন্দর মোটা আকৃতির মানুষ ছিলেন।দেখেতে ইউরোপিয়য়ান জাতি লোকের মত মনে হতো।
উত্তর বাড়ির পশ্চিম দক্ষিন দিকে ছিল কলিম উদ্দিনের বাড়ি।বেশ বড় বাড়ি। আমরা বলতাম কানা কইল্লা গো বাড়ি।আমাদের বাড়ি ঘেঁষা দক্ষিন দিকের বাড়িটার নাম হলো ইদ্রিছ মহাজনের বাড়ি।আমরা বলতাম ফেন মাহজনের বাড়ি। কোন জেবাত খাওয়ানিতে নাকি তারা ডালের সাথে ভাতের ফেন মিশায়েছে। সেই কারণেই নাকি এমন নাম করণ হয়েছে।মহাজন বাড়ির দক্ষিন দিকের বাড়িটার নাম হলো আক্কাছ মিঞার বাড়ি।সে বাড়ির পূর্ব দিকের সার্ট দেয়ালওলা বাড়িটা ছিল মজিদ কেরানীর বাড়ি।মজিদ কেরনী বর্তমান গুডহিলের মালিক ডাঃ হাই সাহেবের বাবা। আক্কাছ মিঞার বাড়ির দক্ষিনের বাড়িটা খানদের বাড়ি।খান বাড়ির দক্ষিনের দিকের বাড়িটা কালির বাপের বাড়ি।
মহাজন বাড়ির পশ্চিম এবং দক্ষিন দিকে মোজাহের ব্যপারির বাড়ি, মনতাজ মিঞার বাড়ি, ইন্নিসপেক্টরের বাড়ি মোক্তার বাড়ি আবদুল্লা মেম্বারের বাড়ি, বন্ডার বাড়ি তুফনি বাড়ি জোগারি বাড়ি, কবি রত্নের বাড়ি ছিল,এখনো আছে।এরা সবাই আমাদের কাছের এবং দুরের প্রতিবেশি। আমরা সবাই সবাইকে কম বেশি চিনতাম।এই সব বাড়িতে অবাধে আমার যাতায়াত ছিল।এদের সাথে সেই সময় আমাদের এক ধরণের আত্মার ও আত্মিয়ের সম্পর্ক ছিল। বন্ধুত্ব ছিল,আন্তরিকতা ছিল, প্রেম ভালবাসা এবং পরশ্পরের প্রতি সন্মানবোধ ছিল। দেখা হলে সালাম আলকি হাসিখুশি কুশল বিনিময় ছিল।ছোটরা বড়দের সামনে বেয়াদপি তো দুরের কথা, ভয়ে কাচুমাচু হয়ে রাস্তা চেড়ে দাঁড়াতো।
সেই সময় মানুষের মধ্যে লজ্জা শরম হায়া বলতে কিছু ছিল।মানুষ তখন অন্যায় কাজ করলে লজ্জা শরমে আত্ম হত্যা পর্যন্ত করতো।আমার এখনো খেয়াল আছে পাকিস্তান আমলেরই কথা আমি তখনও খুবি ছোট।আমাদের প্রতিবেশি টাওরান বাড়িতে এক লোক বাড়ির আড়ায় বড় আম গাছের সাথে ঝুলে ফাঁসি দিয়ে আত্ম হত্যা করেছে।আমার অনুজ দিদারকে মা কোলে করে বাড়ির চাচি জেটিদের সাথে দেখতে দৌড়ায়ে গিয়েছিল সে বাড়িতে।আমি মায়ের পিছনে পিছনে দৌড়ে গিয়েছিলাম।গিয়ে দেখি আনসার পুলিশ এসেছে কিন্তু লাশ তখনও গাছে ঝুলছে। মহিলারা সবাই একটি পাক ঘরে থেকে ঢেঁকির উপর দাঁড়িয়ে দেখছে।আমরা বেশ কয়জন পোলাপাইন খুব কাছে গিয়ে দেখেছি।মৃত লোকটি তখনও বাতাসে মৃদু দুলছে।বড় হয়ে জানতে পেরেছি ফাঁসি দেওয়া লোকটির নাকি ভাবির সাথে কুসম্পর্ক ছিল।তাই জানাজানি হলে লজ্জায় আত্মহত্যা করেছিল।
সেই সময় ছোটরা ঈদে চাঁদে বা পরিক্ষা দিতে যাবার আগে বা নতুন কাপড় চোপড় পড়লে বড়দের পাঁ ছুয়ে সালাম করতো।আশির্বাদ দোওয়া নিত।এখন কি আর সেই সব আছে?
আজ কালকার নতুন জেনেরেশনের কাছে সেই সব তেমন একটা দেখা যায়না।একটা অচেনা অহমিকা কাজ করে সবার ভিতরে ।আজ সবার সাথে সবার দেখা হয়,টেরে বক্করে হে হাই চলে, কিন্তু পরিচয় নাই, সম্পর্ক নাই আন্তরিকতা নেই।পড়শি প্রতিবেশি তো দুরের কথা আজকাল পরিবারের মধ্যেও তেমন একটা আন্তরিকতা বা মধুর সম্পর্ক নেই।হিংসা প্রতি হিংসা মারামারি প্রতি ঘরে ঘরে লেগে আছে। বেশির ভাগই পৈত্রিক স্তাবর সম্পত্তি কিংবা বড় হওয়ার প্রতিযোগিতায় এসব ঘটে থাকে।
মানুষের সভ্যতার প্রথম স্তম্ভ হলো পরিবার।পরিবারকে একটা আদি সংস্হা ও বটে।পরিবার ব্যতীত সমাজ গড়া যায়না,আর সমাজ ছাড়া একটি আদর্শ রাষ্ট্র গড়া যায়না। আজ পরিবার বলতে কিছু নেই,সমাজ বলতে কিছু নেই, রাষ্ট্র বলতে কিছু নেই। যে রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরীহ জনতা সদা পেয়ে থাকে শাসন শোষন লাঞ্চনা বঞ্চনা নিপিড়ন নির্যাতন,  তাকে কি কোনদিন রাষ্ট্র বলা যায়?কি না মধুর ছিল আমাদের অতিতের দিনগুলি!আজ কি নির্মম হয়ে তামাসা করে বর্তমান,দানবের মত হুঙ্কার দিয়ে ডাকছে বর্বর ভবিষ্যত!
এছাড়া আমাদের একটু দুরের প্রতিবেশি বলতে ছিল উত্তরে অনন্ত ছঁতির বাড়ি। বর্তমানে নতুন জেলখানার উত্তর পাশের বাড়িটা।এই রক্ষণশিল হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িটা আজ বেশির ভাগই মুসলমানদের হয়ে গেছে। তাকে অবশ্য জবর দখল বলবো না হিন্দুরা বেশির ভাগই জায়গা জমিন বিক্রি করে ভারত বা অন্যত্র চলে গেছে।এই বাড়িটাতে পুজা অর্চনা যাত্রা পালা গান হতো বিধায় আমার দুর্বলতাটা ছিল একটু বেশি।আমরা দল বেঁধে যেতাম পুজোর দিনে।সারা রাত যাত্রা পালা দেখতাম আর বুট বাদাম খেতাম মাটিতে বসে বসে।সে সব কি কখনও ভূলা যায়?
বর্তমান নতুন পুলিশ লাইনের উত্তর দিকে ছিল  নড় বাড়ি। বাড়িটি ছিল বিশাল আকারের।নড়েরা গানবাদ্য যাত্রা পালা দলে কাজ করেই জিবীকা নির্বাহ করতো। সে বাড়িতেও আমার যাতায়াত ছিল।যুদ্ধের বছর বাড়িটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই পোড়াবাড়িতে আমার কাজিন ব্রাদার আলিয়াজ্জন এর সাথে গিয়ে দেখতে পেলাম একটি ময়না পাখি খাঁছার ভিতর পুড়ে কয়লা হয়ে পড়ে আছে।হৃদয়ে দাঘ কাটার মত একটি দৃশ্য আজকে সাতচল্লিশ বছরেও আমি ভূলতে পারি নাই।মর্মান্তিক বড়ই মর্মান্তিক।পুলিশ লাইনের পুর্ব পাশে ছিল খোনার বাড়ি। সেই বাড়ির দজায় ছিল বিখ্যাত প্রাইমারী স্কুল।

তাছাড়া আমাদের আরেকটু দুরের প্রতিবেশি ছিল  হাসপাতালের পুর্বে লতিফের বাড়ি, পুর্বে মধুপুর, প্রায় আরেকটি খন্ড গ্রাম।পশ্চিম দক্ষিন দিকে জলাদি খেত, পুর্বে পিটিআই, মাইজদী মেইন রোড থানা পুলিশ লাইন।নিউ জেল রোড উত্তর দিক দিয়ে যেয়ে মধুপুরকে দ্বিখন্ডিত করেছে।তবু বর্ষার দিনে মধুপুরকে অনিন্দ সুন্দর জলে ভাসা কোন দ্বীপের মত মনে হতো।   আত্মিয়তার সম্পর্ক ছিল পুর্বে লারি বাড়ি সহ সেকান্দর উকিলের বাড়ি পর্যন্ত।উত্তর পূর্বে মজিদ হাজী বাড়ি।এই সব বাড়িতে বড়দের সাথে কখনও বা একা একা আমার যাতায়েত ছিল।এতসব কিছু বলার আমার এক মাত্র উদ্দেশ্য হলো সেদিনকার আর আজকের মাইজদীর পার্থক্যটা নির্নয় বা বুঝানোর চেষ্টা করা।দেখতে দেখতে চোখের পলকে পলকে কি ভিশন ভাবে বদলে গেছে আমার প্রিয় মাইজদী গাঁ-টি।আমি শুধু অবোধ বালকের মত দেখতেই রয়ে গেলাম।মাইজদী বদলে গেছে কিন্তু আমি যেন একটুও বদলালাম না। সেদিনকার দুরন্ত কিশোর সেই কিশোরই রয়ে গেলাম। মাইজদীর এই পরিবর্তনকে  আমি বিবর্তন বলবো না-  বিকশিত বলবো- না আধুনিকতা বলবো আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা।সত্যিই পারছিনা।মাইজদীর কথা ভাবতে গেলে আমার চোখ দুটি ভরে উঠে মোটা মোটা নোনা জলে।
আমি যে কয়টা বাড়ির নাম উল্লেখ করেছি সব বাড়িগুলি ছিল বিশালাকায়।বিখ্যাত নামকরা বাড়ি। একনামে সবাই চিনত। আবার প্রত্যেক বাড়িই কম বেশি দুর্নামও ছিল।প্রতিটি বাড়ির উঠোনটা ছিল ফুটবল খেলার মাঠের মত বড় সড় ।আমাদের বাড়ির উঠানেই তো আমরা প্রতিদিন খেলাদুলা  করতাম, কাপড় পেঁচায়ে বল বানিয়ে কিংবা কাঁচা জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলতাম, চোর ডান্ডা খেলতাম। মাঝে মধ্যে এক পরিবার বিশষ্ট ছোট খাটো বেশ কয়টা বাড়ি ছিল।একেলা বা দুতিন পরিবারের বাড়ি গুলিও ছিল বেশ বড়সড়। প্রত্যেক বাড়িতেই ছিল দীঘির মত বড় বড় পুকুর। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো  সবুজ সতেজ বড় বড়  আম ঝাম কিংবা নাড়িকেল গাছ। সবুজ গাছ গাছালির সবুজ ছায়া পুকুরের নীলাভ জলে পড়ে জল গুলিও সবুজ দেখাতে। মাঝে মধ্যে আমার ভ্রম হতো। সত্যিই কি পুকুরের জল সবুজ।আমি বার বার হাতে নিয়ে পরিক্ষা করে দেখতাম। জল সত্যিই স্বচ্ছ নীল হীরের মত, সবুজ নয়।
প্রত্যেক বাড়িতেই ছিল জঙ্গলা জাঙ্গলীর মধ্যে ফলফলাদির গাছপালাতে ভরা।আম জাম কাঁঠাল গাব, আরমুজ মন্ডল ডেউয়া কাউ জলপাই কত রকমের ফলগাছ। নাড়িকেল গুবাক বৃক্ষ তো ছিল সারি সারি।মাঝে মধ্যে তাল আর খেজুর গাছও ছিল প্রচুর।তালের রস দিয়ে মা পিটা বানাতেন, আবার ঘন করে রেঁধে ভাত দিয়ে অথবা চিঁড়াদিয়ে খেতে দিতেন। তালের কচি আসাড়ি খেতে এবং আড়িঁর ঠুষা খেতে কতই না মঝা লাগতো।এখনও মুখে টস টস করে পানি আসছে।খেজুরের রস আর শিন্নি খেতে তো মজা ছিল আলাদাই।আমার নানার বাড়িতে ছিল অনেক তাল আর খেজুর গাছ।বড় মামা প্রায়ই আমাদের জন্য নিয়ে আসতেন।তিনি নিজেই খেজুর গাছ কাটতেন।আম ঝামও নিয়ে আসতেন। আবার আমরাও মধু মাসে মামার বাড়ি  গিয়ে  নিজ হাতে পেড়ে আম ঝাম গাব আরমুজ হরতকি ইত্যাদি ফল খেতাম।আমার ছোট চাচাও খেজুর গাছ কাটতেন তার কাছ থেকেও আমরা রস নিতাম।তাছাড়া শীতের সকালে প্রতিদিন গ্রামীন লোকজন মাটির কলস ভরে রস নিয়ে আসতো।লাই ভরে খেজুর গুরের মুরির চাকা নিয়ে আসতো।আমরা পয়সা বা ধান দিয়ে কিনে নিয়ে মঝা করে খেতাম। মছ মছ করে সেই মুরির গোল্লা খাওয়ার মজাই ছিল আলাদা।বহু বছর  ধরে মাইজদীর সেই সব রুচিশিল খাবার থেকে আমি বঞ্চিত।এই সুদুর প্রবাসে আপছোছ করে কেটে যাচ্ছে জীবনের অনাকাঙ্খিত দিনগুলি।
 
 
 




মাইজদী জজ কোর্ট বড় দীঘীর দক্ষিন পাড়ে।






 
                                                   তিন,   
                                                                                                             
                   মাইজদী কে   এক সময় কেউ বলত সুধারাম, কেউ বলত সদর , আবার কেউ বলতো মাইজদী কোর্ট।যে যাহাই বলে থাকুক, আমার কাছে মাইজদী ছিল মায়ের মত অনিন্দ সুন্দর একটি পরম দেশ। ছায়া মায়া মমতা ভরা সবুজ সজিব সুনিভিড় সান্ত শিষ্ট স্নিগ্ধ মুগ্ধ  সোভা মন্ডিত সুভাশিশ একটি পরম দেশ।মাইজদীর দিগন্তবদি যে দিকে তাকাতাম প্রাণ জুড়ায়ে যেত। নিমীশে দুর হয়ে যেত মনের ক্লান্তি। প্রিয়তমা মা মাইজদীই কেবল আমাকে দিতে পারতো দু দন্ড শান্তি।

 মাইজদীর যন্ত্রনাময় বিষন্ন স্বতন্ত্র একটি ইতিহাস আছে।পাচীন ভূলুয়া তথা নোয়াখালির পুরান শহর ইটালীর পম্পে নগরির মত দানব দরিয়ার অতল গহব্বরে বিলিন হয়ে যাওয়ার পর একটি নতুন নগর পত্তন অতি জরুরি হয়ে পড়েছিল নোয়াখালী বাসীর জন্য।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ইথিউপিয়ার রাজধানী এডিডাস অ্যাবিবা আর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের মত সুপরিকল্পিত গোড়পত্তন হয় এই মাইজদী শহরের।ইথিউপিয়ার লিজেন্ড রাজা গাব্রিল হাইলে সালাছি যেমনি সুদুর অষ্ট্রেলিয়া সহ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ফুল ফলাদি বৃক্ষের চাড়া এনে তার দেশের প্রধান শহরকে সাজায়ে নাম দিয়েছিল এডিডাস অ্যাবিবাস।আমহারিস ভাষায় যার অর্থ হলো সুন্দর ফুলের শহর।
ঠিক তেমনি বিংশ শতাব্দির তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে নোয়াখালীর পুরানো পম্পে শহর সাগর গর্ভে বিলিন হয়ে যাবার পর সে পুরান শহর থেকে আট নয় কিলোমিটারে উত্তরে এসে মাইজদী শহরের গোড় পত্তন হয়।বৃহত্তম নোয়াখালী জেলার বিশাল তিনটি মহকুমার ফেনি, লক্ষিপুর, নোয়াখালীর লক্ষ লক্ষ অধিবাসির কথা মাথায় রেখে তৎকালিন   বিখ্যাত বৃটিশ বাঙ্গালী প্রকৌশিলিদের দিয়ে সুপরিকল্পিত নকসা প্রণয়ন করে কৃষানের শত শত একর আবাধি ধানি জমিতে  মাইজদী শহরের গোড় পত্তন করা হয়।
মাইজদী সহীদ মিনার







 ষোল একর জমির উপর  বিশালাকায় দীঘি খনন করে চতুর্দিকে নির্মান করা হয় সরকারি সব প্রতিষ্টান কোর্ট কাছারি স্কুল কলেজ মাদরাসা মসজিদ হাসপাতাল, জেলখানা পুলিশ লাইন আবাসিক প্লাট ভবন দোকান পাট বিনোদন পার্ক।কৃষকের শত শত একর জমিন নামে মাত্র মুল্য দিয়ে হুকুম দখল কিংবা অধিগ্রহন করে নির্মান করা হয় রাস্তাঘাট। পানি নিস্কাষনের জন্য কাটা হয় চতুর্মুখি খাল। অখন্ড বাংলার প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে এনে লাগানো হয় ঝাউ ঝারুল বকুল কৃষ্ণচুড়া শিমুল সহ উন্নত জাতের নানা ফুল ফলাদি বৃক্ষ।মাইজদীর উর্বর পলি মাটিতে  গাছগুলি লকলকিয়ে বড় হয়ে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই এক অনিন্দ সুন্দরে রুপ নিয়ে পর্যটকের দৃষ্টি নন্দন হয়ে উঠে এই মাইজদী শহর।তখন অনেকে পর্যটকের শহরও বলতেন এই মাইজদী শহরকে।  নোয়াখালীর বিলিন হওয়া পুরান শহর যেমনি প্রাচ্যের পম্পে শহর নামে খ্যাতি কুড়ায়, ঠিক তেমনি একসময় মাইজদী শহরও পর্যটকের শহর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নোয়াখালীর প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার লোকজন ছুটে আসতো এই নতুন শহরটাকে এক নজর দেখতে।মাইজদীর বড় মসজিদে নিয়ত করে দুরাকাত নামাজ পড়তে আসতো।বলা বাহুল মাইজদী বড় মসজিদে কালের সাক্ষী হয়ে ঝুলছে পুরান শহর থেকে নিয়ে আসা ঝাড়বাত্তি গুলো। অনেকে আবার সবুজ বৃক্ষের শহর নামে বলতে শুরু করলো। মাইজদী শহরের অর্থই হলো মাঝারি ধরনের সবুজ বৃক্ষাধির শহর। 
পৃথিবীর  সব ঐতিহাসিক স্হান কাল পাত্রকে নিয়ে যেমনি মতনৈক্য বা বিরোধ বিতর্ক আছে, ঠিক তেমনি এই মাইজদীকে নিয়েও বিতর্ক থাকতে পারে। থাকাটাই সাভাবিক।কারো কারো মতে মেঝ দিদির সম্পত্তির উপর মাইজদীর পত্তন তাই মাইজদী নাম হয়েছে।এটার কোন ঠোস সবুত সাক্ষী নাই।সত্য প্রমানিত যে সুধারাম মজুমদার নামে একজন ব্যবসায়ি ও জমিদার মাইজদীর জন্য বত্রিশ কানি জমিন দান করেছিলেন,কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায় তার কোন কন্যা সন্তানই ছিল না। তাই মাইজদীকে তার নামে ডাকা হয় সুধারাম।আবার বৃহত্তম নোয়াখালীর প্রশাসনের মুল কেন্দ্র কোর্ট কাছারি থাকাতে মাইজদী কোর্ট হিসেবেও প্রসিদ্ধী লাভ করে। 
সে যাই হউক আমি কোন গবেষক বা ইতিহাসবিদ নয়।সৃতির পাতা থেকে মনের আবেগে কথাগুলি বলছি।আমার বাবার মুখে শুনেছি মাইজদীর জন্ম ও পুরান শহর ভাঙার দৃশ্য আমার বাবা একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বাবা তখন কর্মজিবী যুবক, স্বচক্ষে  অবলোকন করেছেন সবকিছু।তিনি সেসময় সন্ধিপে চাকুরি করতেন।নদি ভাঙার পর তিনি কেলকাটায় চলে যান।বৃটিশরা নাকি ফেনি লক্ষিপুর বা দুরে অন্য কোথাও নতুন শহর গড়তে চেয়েছিল।তখন হরিনারায়ন পুরের প্রতাপশালি জমিদার রায় বাহাদুর সাহেব নাকি তা হতে দেন নাই।তার বাধার মুখে বৃটিশরা এখানে মাইজদী শহরের পত্তন করতে বাদ্য হয়।
একটি আধুনিক নগর গড়ে তুলতে যা-যা- লাগে বিজ্ঞ প্রকৌশিলিরা মাস্টার প্লান নিয়ে তা-তা- এ শহরে নির্মান করেছেন। নগর বাসির সুবিধার জন্য সুপেয় পানি সুস্বাস্হ সুচিকিৎসা ছেলে মেয়েদের জন্য সুশিক্ষার সুব্যস্হা করা হয়েছে এই শহরে। মাইজদীর এমন সুব্যবস্হা ও সুজোগ সুবিধা দেখে ধীরে ধীরে প্রত্যান্ত এলাকা থেকে ধনি ও শিক্ষিত লোকেরা সন্তানের ভবিষ্যত ও নিরাপত্তার কথা ভেবে এই শহরে এসে বসতি স্হাপন করতে লাগলেন।তারপর থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে আজকের এই মাইজদী শহর।বলা যায় সম্পুর্ন অপরিকল্পিত ভাবে।
বৃটিশ পিরিয়ডে মাত্র ছয় সাত হাজার জনবসতি নিয়ে সাড়ে বার বর্ঘ কিলোমিটার জায়গা নিয়ে গোড় পত্তন হয়েছিল মাইজদীর। আজ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়ত হয়েছে মাইজদীর সীমানা। লোক সংখ্যা হয়েছে লক্ষ লক্ষ।মাইজদী এখন একটি সিটি কর্পোরেশন।আজ মাইজদী শহরে গড়ে উঠেছে উঁচেল উঁচেল দালান কোঠা ভবন সফিংমল, স্কুল কলেজ মসজিদ মন্দির মাদরাসা স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল সহ নানা প্রতিষ্টান।দেশের অন্যান্য জেলার লোকজনও এখন মাইজদীতে এসে গড়ে তুলেছে বসতবাড়ি দোকানপাট।এক কথায় বলা যায় মাইজদী এখন কসমপলিট সিটি।
কিন্তু এই সব কিছুই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত ভাবে।সরকার মাইজদীকে সিটি করপোশনে উন্নতি করে এক নাম্বার ভি, আই, ফি নগর হিসেবেও ঘোষনা করেছে।এ গ্রেডের শহর হলেও মাইজদী আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত।পানি নিঃষ্কানের নেই সুব্যবস্হা, ড্রেন খনন নেই।পানি সরার প্রত্যেকটি কালবার্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।পোল কার্লভার্ট সবি বন্ধ হয়ে গেছে।চারিদিকে আবর্জনার স্তুপ আর স্তুপ, পড়ে থাকে দিনের পর দিন।দুর্গন্ধে মাছিরা ঘ্যান ঘ্যান করছে। অতচ পৌরবাসি কর দেয় প্রতিমাসে মাসে।কর আদায়ের কুঠি কুঠি টাকা চলে যায় দুর্নীতিবাজ আর ঘুষখোরদের পকেটে।মাইজদী বাসি সকল মৌলিক চাহিদা গুলি যেমন ইলেট্রিক গ্যাস, পানি টেলিফোন চিকিৎসা সেবা থেকে প্রায় বঞ্চিত।রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, কোন কোন খানে তো চলাফেরার অনুপুযোগি হয়ে পড়েছে।মাইজদী আজ হারিয়েছে তার ঐতিহ্য প্রাচুর্য এবং প্রকৃতিক সুন্দুর্য।






মাইজদী শিল্পকলা একাডেমি
আপছোস! আজ আমাদের বড় দুর্ভাগ্য! যে বড় দীঘির সুপেয় পানি নগর বাসিকে সাপলাই করা হতো,যে দীঘির পানি পান করে তৃষ্ণার্ত পথিক অনাবিল তৃপ্ত হতো, যে দীঘির পাড়ে ঝারুল বুকুল তলায় ক্লান্ত পথিক দুদন্ড বিশ্রাম নিয়ে শ্রান্ত হতো, সেই পার্কের গাছগুলি কেটে বানানো হয়েছে মৌশুমি গরুর বাজার।গস্তানি মাস্তানির আড্ডাখানা।আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি এই শহরের সুন্দুর্য সৌরব গৌরব আর সজিবতা।অবশ্য প্রচুর গনচাপে এখন দীঘির দক্ষিন পাড়ে  ছোট একটি শিশুপার্ক নির্মান করা হয়েছে।কিন্তু শিশুর চেয়ে শতে শতে তরুন তরুনীরা এসে জোড়া বেঁধে আড্ডা জমায়। ঝালমুড়ি চানাচুর ডালের ভরা গুলগুইল্লা খায়।লোকে বলে প্রেমিক প্রেমিকা।
 দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক এই তীলত্তমা এই মাইজদী শহরের ঐতিহ্য।এখন ও সময় আছে সজাগ হবার,আগামি প্রজন্মের জন্য মাইজদীকে নতুন করে গড়ে তোলার।
 


 

কালের সাক্ষী মাইজদী শহরে অবস্হিত বড় জামে মসজিদ

কালের সাক্ষী হয়ে সোভা পাচ্ছে মাইজদী জামে মসজিদ। লোকে এটাকে বড় মসজিদ  বলে ডাকে। কালের সাক্ষী বলছি এ কারণে, এই মসজিদটিতে এখনো রক্ষিত আছে সাগরের অতল  গহব্বরে নোয়াখালীর পুরান শহর বিলীন হয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহুর্তে উদ্ধার করা  পুরান শহরের জামে মসজিদের দু-চারটা ঝাড়বাত্তি।সংরক্ষিত বাতিগুলি মাইজদী শহরে নির্মিত নতুন জামে মসজিদে এখনও সোভা পাচ্ছে। আল্লাহর অপার কৃপা আলহামদুলিল্লাহ! এই ঝারবাতি গুলিই কালের সাক্ষী।এই বাতি গুলিই প্রমান করে যে শিল্প সাহিত্যে স্হাপত্ব্য শিল্পে, কৃষ্টি কার্লচারে সভ্যতায়  কত যে সম্বৃদ্ধ ছিল এক সময়ের ভুলুয়া সমতট আমাদের এই প্রাণের  নোয়াখালী হারিয়ে যাওয়া সেই  পম্পে নগরি।



১৬ কানি জমিন নিয়ে বড় একটা দীঘি কাটিয়ে

সুপ্রষিদ্ধ প্রকৌশিলিদের দিয়ে সুপরিকল্পিত ভাবে একটা মনোরম পরিবেশে সুনিপুন ভাবে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। মসজিদদের পশ্চিম পাশে ঘাঁট পাকা  একটা দীঘিও কাটা হয়েছে। এই দীঘিটির পাড় ঘেঁসেই দক্ষিন পাড়ে নির্মিত হয়েছে নোয়াখালী জেলা স্কুল। আবার মসজিদের দক্ষিন পাশেই বড় মাদরাসা নির্মিত হয়েছে। আবার মসজিদের উত্তর পাশে আছে ইসলামি পাঠাগার।বর্তমানে দীঘির উত্তর পাড়ে গড়ে উঠেছে সাড়ি সাড়ি  দোকান। তার মধ্যে বেশির ভাগই বইয়ের দোকান।নোয়াখালীর দুর-দুরান্তের প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে আজো হাজার হাজার লোক মানত বা ভাসনা  করে ছুটে আসে এই মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য।কিছু দান খয়রাত করার জন্য।ছোটবেলায় সবেবরাতের প্রতিরাতে আমরা প্রার্থনার উৎসব করতাম এই মসজিদের ছাদে।জিগির আজগর বারবার নামাজ পড়ে সাড়ারাত কাটাতাম এই মসজিদে।

 






 



 
































মাইজদী সরকারি বিশ্বব্যিালয়



faruq.mohammed0@googlemail.com