পৃষ্ঠাসমূহ

শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

সাগরকন্যা মাইজদী...



                                            একাত্তরের পুর্বের মাইজদী,

ছোট বেলায় আমার একটা অসুখ ছিল।অসুখ ছিল মাথা গুরানির অসুখ।এই চার ছয় মাস ভাল আছি।ঋষ্টপিষ্ট সুন্দর চপল প্রকৃতির খোকা ছিলম আমি।হঠাৎ করে মাথা গুরানি উঠলে বমির পর বমি আসতো।কিছুই খেতে পারতামনা।একনাগাড়ে চার পাঁচদিন ঠান্ডা বিছানায় কাঠ হয়ে পড়ে থাকতাম। মা বারবার কলার বরগ মাথার তলে দিয়ে পানি ঢালতেন, অন্য কোন কাজের বেডিকে দিয়েও ঢালাতেন। আবার আমার সেজবোন নুর নাহারও অনবরত পানি ঢালতেন।কোন ঔষুধপত্ত লাগতো না, এমনিতেই ভালো হয়ে যেতাম।এরকম অসুখবিসুক থাকলেও আমার শ্মরন শক্তি ছিল অত্যান্ত প্রখর।এখনও এই মধ্য বয়সেও সেই রকমই আছে।আর তাই শৈশবের সৃতিগুলি আজ কায়মনে অনর্গল আওড়ানোর চেষ্টা করছি।
আমরা ভাই বেরাদর কেহই আমার দাদাকে দেখিনি।আমার দাদা এমরাত আলি নাকি অল্প বয়সেই আট সন্তান রেখে মারা গিয়েছেন।সাত ছেলে এক মেয়ে।বাবার  এবং দাদির মুখে শুনেছি তাঁর নাকি পেটের ব্যদনার অসুখ ছিল।দাদাকে না দেখলে কি হবে আমরা চাচাতো ভাই জেটাতো ভাই প্রায় সবাই দাদিকে দেখেছি।এই তো সেদিন উন্নিশ ছিয়াশি সালের মাঝামাঝি সময়ে শতাধিক বছর বয়সে আমার দাদি ইন্তেকাল করেছিলন। আমার শ্পষ্ট খেয়াল আছে সেদিন সন্ধায় আমিই দাদির সাথে শেষ কথা বলেছিলাম।দাদির ঘর আমাদের ঘরের সামনে ছিল।সন্ধ্যেবেলায় মা আমাকে কিছু পান সুপারি দিয়ে বললো তোর দাদিকে দিয়ে আয়।আমি দিতে গেলে দাদি বললো কিচু সেঁছে দে।দাদির মুখে একটি দাঁতও ছিল না।তাই বড় লৌহার একটা সেঁছনি একটা মাটির কলস আর দুতিনটা মাটির ভাসন আর নারিকেলের মালার কয়টা  টকবা ছিল দাদির সম্পদ।  দাদি থাকতেন একটি ছোট ছনের ঘরে, পরে অবশ্য একোয়ারের পর সবাই মিলে উনাকে বড় করে টিনের একটা ঘর করে দিয়েছিলেনে। উনি সে ঘরে একেলা থাকতেন।বেশ বড় একটি চৌকিতে গুমাতেন। মাঝেমধ্যে আমার কাজিন ব্রাদার মাহার সেলিম ভাই এসে দাদির সাথে গুমাতেন।দাদির সেই ঘরে তার সাত সন্তান সবাই বুড়ো বুড়ো নাতি নাতকুর সবাই এসে বসতেনেআসে পাসের পড়সিরাও এসে বসতেন। দাদির সাথে কথা বলতেন আড্ডা দিতেন দাদিকে পান সেঁছে দিতেন।নিজেরাও খেতেন,পাতিল ভরে কেউ হয়তো লাল চা বানিয়ে দিয়ে যেতেন।ভাসন ভরে মিটা ছাড়া লবন চা টগবা ভরে খেতেন। দাদির জন্য খাবারও আসতো সবার ঘর থেকে।কোন বাঁধাধরা নিয়ম ছিলনা।বেশির বাগই যেত আমাদের ঘর থেকে।দাদি আমার মায়ের হাতের খাবারই বেশি পছন্দ করতেন।আমার মাকে এবং আমার মাকেও বেশি ভালোবাসতেন।আমার মা-ই ছিল বাড়ির সবছেয়ে বড়বধু। যদিও আমার বাবা ছিলেন সবার মধ্যে সেজ।
সেই এক রুপ কথার গল্পের মত। অনেক কথা অনেক গল্প কোনটা থুয়ে কোনটা বলবো।একজন হিন্দু কবিরাজ দাদির ঘরে এসে বসতেন,দাদিকে ঔষুধ দাওয়াই দিতেন।একআনা দুআনা পয়সা দাদি তার হাতে দিতেন। সেই কবিরাজের নাম ছিল হরকুমার।তার মুখেও একটি দাঁতও ছিলনা।দাদির মত সেঁছা পান খেতেন।মুখদিয়ে লাল লাল পানের রস গড়িয়ে পড়তো।হরকুমারের ছিল এক পুত্র, সেও আবার কবিরাজ।তার নাম ছিল নরকুমার। তার মুখে ছিল মাত্র একটা দাঁত। সেও সেঁছা পান চিবাতো।আমার শ্পষ্ট খেয়াল আছে অনেক সময় এই কবিরাজদের নিয়ে হাসির তুফান উঠতো দাদির ঘরে।
দাদি আমাকে ভাই ডাকতো।সেই নেংটা বয়স থেকে দাদি আমাকে সাথে নিয়ে পুকুরে গড়ে মাছ ধরতে যেতেন।সেসময় মছে ভরা ছিল পুকুর ডোবা কুয়া গড়ে।অনেক গুলি বড়শি পেলে রাখতেন।পেতেনও একটু পরপর উঠাতেন।মাছ ধরে থাকতো। পরে মাছ নিয়ে মায়ের কাছে দিতেন মা পাকায়ে দিতেন।দাদি অনেক সময় আমাকে খেপাতো এই বলে যে অমুকের গরু তোগো ধান খাই পালাইতেছে।আমি তখন গালাগালি করতে করতে বাড়ির সামনের দিকে ছুট দিতাম।আর মা আমাকে কোলে করে তুলে আনতেন।
ছোট বেলায় মা আমাকে একটা লুঙ্গি কিনে দিয়েছিল।আমি লুঙ্গিটা মোটেই পিন্দতামনা। সমবয়সি সবাই থাকতো বেশির ভাগই নেংটা।আমি কেন লুঙ্গি পিন্দবো? আমি লুঙ্গিটা সবসময় কাঁদে ঝুলিয়ে রাখতাম।একবার আমরা সমবয়সি কয়টা ছেলে পুকুর পাড়ে পাঠ কাটি জ্বেলে বিঁড়ির মত খাচ্ছিলাম।সবাই নেংটা বাদাম।হঠাৎ করে আমার চাচাতো ভাই রহিম জলিলের মাথায় জোরে দুষ্টমি করে একটি পাদ দিল।জলিল মাথা নোয়ায়ে হরমুল ধিরাচ্ছিল। অমনি রহিমের পাদের সাথে সাথে বাহির হলো পাতলা পায়খানা।আর সবগুলি জলিলের মুখে মাথায়।সাথে সাথে সবাই হাসতে হাসতে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
 
তখনও আমাদের দেশটা ছিল অখন্ড পাকিস্তানের পাঁচটা প্রদেশের মধ্যে একটা মাত্র প্রদেশ বা খন্ড।যা পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিগনিত হত।চীপ মার্শল লৌহ মানব হিসেবে খ্যাত আইয়ূব খান তখন অখন্ড পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্টিত।বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের দাবিতে পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যযজ্ঞের পর পুঁষে উঠা বাঙ্গালী যুক্তফ্রন্ট ঘটন করে সরকার ঘটন করে।যুক্তফ্রন্টের সংসদে একটি মারামারিও হট্রগোলকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলার অযুহাত তুলে জেনারেল আইয়ূব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তিনি সর্বেসর্বা হয়ে বসলেন।তিনি অসুন্তষ্ট বাঙ্গালীকে সন্তুষ্ট করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করলেন।প্রথমে তিনি একটি বই লিখলেন, প্রভূ নয় বন্ধু।তারপর তিনি বেসিক ডেমক্রেসি বা মৌলিক গনতন্ত্র  নামে এক অদ্ভূত গনতন্ত্রের নাম ঘোষনা করলেন।তাছাড়া তিনি অবহেলিত অনুন্নত পুর্ব পাকিস্তানে উন্নতির জন্য বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহন করেন। এমনকি এই স্বৈরচার বাংলা ভাষাকেও বদল বাংলা উর্দু মিলায়ে এক অদ্ভূত ভাষা সৃষ্টি করারও পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।যা ডান বাম দিক থেকে নয় চায়না ভাষার মত উপরের দিক থেকে লিখা হবে।ইতিহাস বলে অখন্ড পাকিস্তানে একমাত্র আইয়ূবের শাসনামলেই বেশি উন্নতি হয়েছিল।সে যাই হউক আইয়ূবের সেই উন্নিতির বলি হয়েছি আমরা পশ্চিম মাইজদীর শতাধিক পরিবার।
 
একোয়ারে আমাদের বিশাল বাড়িটার প্রায় কম অর্ধেক পড়ে গেল।আমাদের দুটা বড় পুকুরের অর্ধ্যেক ভরাট করে,বাগানের গাছগাছরা কেটে টোটালি উদাম নেংটা বাড়িতে পরিণত করলো।দক্ষিন দিকে ছাড়া বাড়িতে পর্যাপ্ত জায়গা থাকাতে জঙ্গল কেটে কয়েকটি পরিবার সেখানে ঘর সরিয়ে নিল। আবার দুতিনটি পরিবার দুরে অন্যত্র গিয়ে ঘর বাঁধল।











   

কোন মন্তব্য নেই: